বিদায় ‘চট্টলবীর’ মহিউদ্দিন চৌধুরীর না জানা কথা

সালেহ নোমান (আবাসিক সম্পাদক, চট্টগ্রাম অফিস): ১৯৯৪-২০১০ টানা ১৭বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী চির বিদায় নিয়েছেন গত শুক্রবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাতে। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারি দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এরপর আমৃত্যু একই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন সংগঠক ছিলেন। সব মিলিয়ে জনদরদি বলতে যা বোঝাই তাই ছিলেন। কিন্তু একজন মহিউদ্দিন চৌধুরীকে এসব পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা সুযোগ নেই। এলাকাবাসির কল্যাণে যা প্রয়োজন তার সবকিছুর মধ্যেই তিনি ছিলেন। এই রকম একজন ব্যাক্তিকে কোন বিশেষণে ধরে রাখা সম্ভব ? তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। তার ১৭ বছরের মেয়র থাকা কালে চট্টগ্রাম যেমন পরিচ্ছন্ন নগরীর স্বৃীকতি পেয়েছিলো তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এসব নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার উল্লেখ যোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। টানা ১৭বছর মেয়রের দায়িত্বে থাকা কালে একাধিকবার বন্দিও হয়েছিলেন। প্রথমবার বন্দি হয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলনের কারণে। মেয়রের দায়িত্বে থাকা কালে দ্বিতীয় বার গ্রেফতার হয়েছিলেন ২০০৭সালে জরুরী অবস্থার সময়। এছাড়াও একাধিকবার গ্রেফতারের শংকায় ছিলেন প্রতিবাদি এই নেতা।
২০০৩সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শুরু হয়েছিলো অপারেশনা ক্লীন হার্ট। সেই সময়ও গ্রেফতার হতে পারেন মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা, এমন গুজব ও আশংকা ছিলো। এই শংকার মধ্যে অনেক আওয়ামীলীগ নেতা গাঁ ঢাকা দিলেও নিয়মিত অফিস করতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। স্বাভাবিক কাজকর্ম করেছেন, তবে সচেতন ছিলেন যাতে সরকার তাকে গ্রেফতারের কোন উপলক্ষ্য যাতে না পায়। সেই সময় তার কাছাকাছি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২২নং এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের তৎকালিন কমিশনার এম এ মালেক।
“সন্দ্বীপ” পত্রিকাকে এম এ মালেক বলেন, একদিন করপোরেশন ভবনে মেয়রের কক্ষে কথার কথায় মহিউদ্দিন চৌধুরী তখনকার প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তাকে বলছিলেন যে যেকোন সময় করপোরেশন ভবন তল্লাশি করা হবে, তাদেরকে আটকও করা হতে পারে। আমি তখন মেয়রকে বলেছিলাম. গ্রেফতার হলে আপনি হবেন, প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা কেন গ্রেফতার হবেন, উনি তো সবকিছু আপনার নির্দেশ ক্রমে করেছেন, অনেকগুলো ফাইলে তো লেখা থাকে- “মেয়র মহোদয়ের নির্দেশ ক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।”
বিষয়টা বুঝতে পেরে তখন মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাকে বললেন অফিস শেষে যেন তার সাথে কথা বলি। আমি বিএনপির সাথে যুক্ত হলেও মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাকে বিশ্বাস করতেন। উনি সহ আমরা অনেক কাজ করেছি। কি করা দরকার আমার পরামর্শ চাইলেন। করপোরেশেনের অনেকগুলো ফাইলে লেখা হয়েছে ‘মেয়র মহোদয়ের নির্দেশক্রমে করা হচ্ছে’ কতগুলো ফাইলে এই ধরনের লেখা আছে তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিলাম। এরপর তিনি ওই প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তাকে বাসায় ডেকে নিয়ে এই ধরনের সকগুলো ফাইল সংশোধন করা নির্দেশ দিলেন। তখন করপোরেশনে বলাবলি করা হচ্ছিলো, করপোরেশন থেকে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় প্রায় আট হাজার ফাইল নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো চেক করার জন্য। টানা দুই/তিন দিন ওই প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা সবগুলো ফাইল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তারপরে নিস্কৃতি পেয়েছিলেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর মাথায় যা আসতো তা তিনি করেই ছাড়তেন। যখন প্রচন্ড রেগে যেতেন তখন দুই হাত একটার সাথে আরেকটা ঘষতেন। আর খোশ মেজাজে থাকলে গোঁফে তা দিতেন। উনি রেগে গেলে সবাই তার আশপাশ থেকে সরে যেতো। তবে, আমাকে সমিহ করতেন। একবার এই রকম রেগে যাওয়ার পর ওনার চেম্বার থেকে সবাই সওে গিয়েছে। আমি যাওয়ার সময় প্রচন্ড রেগে জিজ্ঘাস করছিলেন কেন এসেছি। বললাম এখানে নাকি তুফান উঠেছে, দেখতে আসছি, সাথে সাথে হেসে দিয়েছিলেন।
এম এ মালেক বলেন, আমার সাথে বিশেষ সম্পর্কের কারণ হচ্ছে অনেক দিন ধরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর খাওয়া- দাওয়ার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করেছিলেন চিকিৎসকরা। বিধি নিষেধের মধ্যেও এনায়েত বাজারের বিখ্যাত চিড়া ও মাঠা ছিলো তার অত্যন্ত প্রিয় খাবার। আমি নিয়মিত তা পাঠাতাম।
মহিউদ্দিন চৌধুরী চলে গেলেন। সময় যতো গড়াবে, চট্টগ্রামের মানুষ তার অভাবটা ততো বুঝতে পারবে। তার আন্দোলনের ধরণ নিয়ে ভিন্নমত আছে। কিন্তু, চট্টগ্রামের প্রতি তার প্রেম নিয়ে ভিন্নমত?

দরবার-ই-জহুর,
মহিউদ্দিনের
হরিজন তত্ত্ব ও
ফকিরপাড়ার মা
নাসিরুদ্দিন চৌধুরী
যেসব রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে মহিউদ্দিন নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছে, তাকে আমি খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছি। আমি সে সুযোগ পেয়েছি, কারণ এখনকার মত তখনও আমি সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলাম। সাংবাদিক আরো ছিলেন কিন্তু তারা তো আর আমার মতো মুক্তিযোদ্ধা বা মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। এসময় চট্টগ্রাম থেকে নাম, ভাব, ভাষা ও ভঙ্গিতে ‘পূর্বকোণ’ নামে একটি আধুনিক দৈনিক-এর আত্মপ্রকাশ ঘটলে আমি সে পত্রিকায় বার্তা বিভাগের প্রথমে ডেপুটি, এক বছর পরে বার্তা প্রধানের দায়িত্ব পাই। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও পূর্বকোণ দুটি ভাই বা বন্ধুর মত হাত ধরাধরি করে সমুখে অগ্রসর হয়েছে এবং অচিরে চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠা ও সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক হিসেবে পূর্বকোণ পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।
মহিউদ্দিনের জনপ্রিয়তার পারদ কখন থেকে উর্ধমুখী হয়েছে?
আমি জানিনা কার কি মত; কিন্তু আমার ক্ষুদ্র অভিমত হলো, মধ্য আশি থেকে খুব ধীরে তার উর্ধারোহন শুরু হয়েছিলো, তবে তা’ গতিবেগ পেয়েছিলো ৯০-এ, আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে ৯১-এর ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী মহিউদ্দিন চৌধুরীর অসাধারণ মানবসেবা ও ত্রাণ কার্যক্রম থেকে। এই সময় মহিউদ্দিন চৌধুরী জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কর্মোদ্যোগ নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা রাজনীতির মাঠে-ময়দানে কর্মতৎপর ছিলেন। আর পূর্বকোণে এসব কর্মকা-ের সচিত্র সংবাদ ফলাও করে প্রকাশিত হতো। আমার জন্যই হতো, কারণ আমিই ছিলাম বার্তা সম্পাদক। নিউজের পাশাপাশি ইদরিস ভাইকে (ইদরিস আলম) নিয়ে আসি কলাম লেখার জন্য। তিনি দিস্তার পর দিস্তা কাগজে লিখে ছাপানোর জন্য পত্রিকা অফিসে ধর্না দিয়ে বিফলমনোরথ হয়ে নিউ মার্কেটের বিপরীতে জলসার পাশে কারেন্ট বুক সেন্টারে বসে থাকতেন। মানিকদা’র বিচক্ষণ পুত্র দীপংকর চৌধুরী কাজল আমাকে নিয়ে ইদরিস ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিলো। এমন সময় এই যোগাযোগটা ঘটলো যখন আমি একজন রাজনৈতিক নেতাকে খুঁজছিলাম, যাঁকে দিয়ে কলাম লেখানো যায়। তিনি তাঁর দুঃখের কাহিনী আমার কাছে বিবৃত করে বললেন, তাঁর লেখাগুলি যদি আমি প্রকাশ করি তাহলে তিনি কৃতার্থ হবেন।
আমি তো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেলাম। কারণ এ ব্যাপারে তিনিই যোগ্যতম ব্যক্তি। ছাত্রজীবন থেকে তিনি লেখালেখি করে আসছেন। বক্তৃতা আর লেখাÑএই দু’টি তাঁর চর্চার বিশেষ ক্ষেত্র এবং দু’টি কাজেই তিনি পারঙ্গম। এস এম ইউসুফ, শওকত হাফিজ খান রুশ্নি যদি তাঁদের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করে শুধু লেখালেখির কাজে মনোনিবেশ করতেন, তাহলে দু’টি ক্ষুরধার লেখনির জন্ম হতো। কিন্তু তা তো হলো না। আর ছিলেন পুরোনোদের মধ্যে ফেরদৌস কোরেশী, শহীদ মুরিদুল আলম, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান, অনতি পরবর্তী অধ্যক্ষ শায়েস্তা খান এবং আরো একটু পরের মানুষ অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ। তাঁদের সময়ে তাঁরা লেখেন নি, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান ও শায়েস্তা খান শিক্ষকতা পেশায় গিয়ে পেশা জীবনের শেষদিকে এসে তাঁরা যে লিখতে পারেন সেকথা তাঁদের মনে পড়ে যায় এবং তাঁরা লেখালেখি শুরু করেন। মোহাম্মদ হোসেন খান চমৎকার কিছু কলাম লিখে আমাদেরকে তাঁর লেখার স্বাদে বুঁদ হয়ে থাকার আবেশে মজিয়ে পাততাড়ি গোটান। শায়েস্তা খান ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়ত লেখালেখিটা চালিয়ে যাবার প্রাণান্তকর প্রয়াসে লিপ্ত আছেন। আবদুর রউফ খালেদ লিখলেন না। ফেরদৌস কোরেশী ঢাকায়, হারুনুর রশিদ পেশাগত কাজে নানা স্থানে ভ্রমি হঠাৎ জাসদের মধ্য দিয়ে যেন অগ্নিস্পর্শে জ্বলে উঠতে চেয়েছিলেন। মুরিদুল আলম একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে জীবন দান করে শহীদ হয়ে অমরত্বের মহিমা লাভ করলেন। আরো পরের একজন ছাত্রনেতা ফজলুল হকের মধ্যে যে একটি লেখকসত্তা লুকিয়ে ছিলো, দৈনিক আজাদী ও তার সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ না হলে সেটা আমাদের কখনো জানা হতো না। তাঁরা ফজলুল হককে আবিষ্কার করলেন; ফজলুল হক ততদিনে শিক্ষকতার গভীরে প্রবিষ্ট হয়ে বেশ নামধাম করে ফেলেছেন। খালেদ সাহেব তাঁকে দিয়ে লেখাতে লেখাতে তাঁকে একজন সফল ও জনপ্রিয় কলাম লেখকের তকমা পরিয়ে দিলেন। আমি তাঁকে পূর্বকোণে লেখার আমন্ত্রণ জানালাম। তারপর পূবের্েদশে এবং এখন আরো অনেক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখেন।
তো যাই হোক, মোহাম্মদ হোসেন খান, শায়েস্তা খান, ফজলুল হক লেখালেখিতে আসলেন মাঝখানে বিরতি দিয়ে। সরাসরি রাজনৈতিক জীবন থেকে আসেন নি। তাঁদের লেখালেখি ও রাজনৈতিক জীবনের মাঝে পেশা একটি ছেদ টেনে দেয়।
অবিভক্ত ও বিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের অনেক নেতা কলাম লিখতে পারতেন, কিন্তু কেউ লেখেননি বা সার্বক্ষণিক পার্টির কাজের মধ্যে ডুবে থেকে তাঁরা লেখার জন্য কোন অবকাশ পান নি। কল্পতরু সেনগুপ্ত ও কল্পনা দত্ত (নেহরুর ভাষায় বাহাদুর লেড়কি) লিখতে পারতেন, কিন্তু দেশভাগের পরে তারা ভারতে চলে যান। পূর্নেন্দু দস্তিদারের সাহিত্য প্রতিভা আমাদেরকে দু’চারটি বই উপহার দিলেও তিনি সংবাদপত্রে কলাম লেখেন নি। কলাম লেখার চলও তখনো হয় নি। দেবেন শিকদার, শরদিন্দু দস্তিদার লিখতে পারতেন কিন্তু লেখেন নি। চৌধুরী হারুন, অ্যাডভোকেট শফিউল আলম, অ্যাডভোকেট এ কে এম এমদাদুল ইসলাম, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ লিখতে পারতেন, লেখেন নি। কাজী জাফরুল ইসলাম সাংবাদিকতা পেশা অবম্বলন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু কলাম লেখার কথা তাঁরও মনে হয় নি। প্রবীণ নেতার মধ্যে অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন রাজনীতিবিদ হলেও একই সঙ্গে সাহিত্যিকও ছিলেন। তিনি অনেক বই-পুস্তক রচনা করেছেন এবং জীবনের শেষদিকে পত্র-পত্রিকায় লেখাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু কলাম বলতে যা বোঝায় তা’ তিনিও লেখেননি। ষাট দশকের ছাত্রনেতার মধ্যে মাহবুবুল হকের সাহিত্য প্রতিভা ছিলো। গুছিয়ে কাজ করা তাঁর আজীবনের অভ্যাস। ছাত্রজীবনেই তাঁর ভাষাজ্ঞান ও শিল্পরুচির প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি শিক্ষকতা পেশা অবলম্বন করে সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ফলত তাঁর হাত থেকে সাহিত্য গুণ সম্পন্ন বেশকিছু গ্রন্থ বের হয়। ভাষাতত্ত্বের প্রতি আগ্রহ ছিলো, তিনি সেদিকেই ঝুঁকে পড়েন এবং একাধিক ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তিনি বানান বিষয়েও বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন এবং গ্রন্থ রচনা করেন।
যাই হোক, আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। ইদরিস আলম আমাকে তাঁর লেখা এনে দিলেন। আমি সেগুলি একবার চোখ বুলিয়ে বুঝলাম চড়া তারে বাঁধা ইদরিস আলমের গদ্যভাষা বিপজ্জনক বিস্ফোরক ছাড়া আর কিছুই নয়। একটু ঘষামাজা করে পরিবেশন করতে পারলে সেগুলি এক একটি বোমা হয়ে ফাটবে। “আমরা তখন যুদ্ধে” নাম দিয়ে আমি সেই বোমাগুলি ফাটালাম। ধুন্ধুমার কা- হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে গেলো শহরে। এমনি করে মহিউদ্দিনের সংবাদ আর ইদরিস আলমের কলাম দিয়ে পূর্বকোণ বাজিমাৎ করলো। তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্জন্ম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণের যুগ। বিজয় মেলা, একুশ মেলার উদ্যোগ-আয়োজনে তারই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।
৮৮ থেকে ৯০ মহিউদ্দিনের টেক অব পিরিয়ড। রানওয়েতে তখন আরো একজন নেতা দৌঁড়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁকে মহিউদ্দিনের কনটেন্ডার মনে হচ্ছিলো। তিনি বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান। দু’জনের মধ্যে ফাস্ট রাউন্ড খেলা হয়ে গেলো ৯১-এ। মহিউদ্দিন ও নোমান সে বছর সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হলেন। আমার ঘাটফরহাদবেগ খলিফা পট্টির নাজের কলোনীর বাসায় মান্নান ভাই (এম এ মান্নান, সাবেক মন্ত্রী), মহিউদ্দিন ভাই, নাছির ভাইকে (আ.জ.ম নাছির, বর্তমানে মেয়র) নিয়ে একটা বৈঠক হলো, বৈঠকে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে তিনজনের মধ্যে ছোটখাট ভুল বোঝাবুঝি নিরসন করে একটা সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলো। মান্নান ভাই, নাছির ভাই ওয়াদা করলেন তাঁরা আন্তরিকভাবে মহিউদ্দিন ভাই’র ভোটে কাজ করবেন। কাজ তারা করেও ছিলেন। কিন্তু মহিউদ্দিন ভাই সম্ভবত ১২০০ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন। এটা হয়েছিলো সিরাজ মিয়ার জন্য। মিয়া বাকশাল থেকে ভোটযুদ্ধে নেমে নগণ্য ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে তাঁর জল ঘোলা করার কারণে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অন্তত পঁচিশ/ত্রিশ হাজার ভোট নষ্ট হয়েছিলো। তবে ৯০-তে মহিউদ্দিন নগরে যথেষ্ট শক্তিশালী নেতা। যার প্রমাণ পাওয়া গেল, চুরানব্বই-এ দ্বিতীয় দফা লড়াইয়ে মহিউদ্দিনের গলায় বিজয়মাল্য উঠেছিলো।
আমি যে মহিউদ্দিন চৌধুরকে সমর্থন করা শুরু করেছিলাম, তার আরেকটা গূঢ় কারণ ছিলো। সেটা হচ্ছে তিনি মনে করতেন আমি এসএম ইউসুফ-এর ধারায় রাজনীতি করি। এস এম ইউসুফকে প্রমোট করি। এর মধ্যে যে সত্যতা নেই তাও নয়। এসএম ইউসুফ আর আমার বাড়ি এক জায়গায়-পটিয়ার পাশাপাশি দুটি গ্রামে। আমি ছাত্র ইউনয়ন করতাম। ৬৫-৬৬ সালে এসএম ইউসুফের কারণে ছাত্রলীগে আসি। সুতরাং ইউসুফ ভাই’র প্রতি আমার একটা দুর্বলতা থাকাই ছিলো স্বাভাবিক। অন্যদিকে মহিউদ্দিন ভাইকেও আমি ৬৭ সাল থেকে চিনি। আমি দু’নেতাকে সমভাবে সম্মান ও তাদের কথা শুনতাম। তবুও ইউসুফ ভাই’র প্রতি কিছু পক্ষপাত থাকতেই পারে। না থাকলেও মহিউদ্দিন ভাইর তাই মনে হত। তাই তিনি আমাকে খোঁচা মারার সুযোগ পেলে তা’ হাতছাড়া করতে চাইতেন না। দেখা হলেই তিনি আমাকে বলতেনÑ“তুঁই ত ইউসুফ’র মানুষ, তুই আঁর লাই হাম গরিবা না?” একদিন তাঁকে আমি বলেছিলাম, “সময় আসুক, দেখবেন আমি আপনার জন্যও কাজ করবো।” সেই কাজ করার জন্যই আমাকে মহিউদ্দিন ভাই’র সঙ্গে ভিড়তে হয়েছিলো।
৯৪-এ তাঁর প্রথম মেয়র নির্বাচন নাগরিক কমিটির ব্যানারে হয়েছিলো। এই কমিটির আমি অন্যতম সংগঠক ছিলাম। সিএসপি আহসান সাহেবের ভাই জাহেদ সাহেব ছিলেন চেয়ারম্যান, ড. আবু ইউসুফ ছিলেন সেক্রেটারি। মহিউদ্দিন ভাই’র নির্বাচনী প্রতীক ছিলো হ্যারিকেন। নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশনার দায়িত্ব পড়লো আমার ওপর। আমি সাংবাদিক পংকজ দস্তিদার ও অনুপ খাস্তগীরকে নিয়ে ঘাটফরহাদবেগ কাটা পাহাড় লেইনে শান্তি প্রেস থেকে মেনিফেস্টোটি ছাপিয়েছিলাম। মহিউদ্দিন ভাই’র বন্ধু রঘুবাবুও ছিলেন।
মহিউদ্দিন ভাই আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন। আমার পরামের্শ একদিনের নোটিশে তিনি চেরাগী পাহাড়ে মিলেনিয়াম উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। শেফালী ঘোষ সেখানে গান গেয়েছিলেন। ইউনেস্কো যেবার আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করলো, সেটা উদযাপন করার জন্য তিনি কর্পোরেশন থেকে উদযোগ নিলেন। মেয়র হিসেবে কমিটির চেয়ারম্যান তাঁকেই হতে হয়েছিলো। আমাকে করেছিলেন সদস্য সচিব।
একুশ মেলা নামে চট্টগ্রামে একটি বইমেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য আমি বহুদিন ধরে চেষ্টা করে আসছিলাম। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনকালে তাঁকে বইমেলার কথা বলায় তিনি তারও দায়িত্ব নিলেন। বইমেলারও চেয়ারম্যান তিনি, সদস্য সচিব আমি।
আমাকে দিয়ে ‘নগর সংবাদ’ নামে বাংলা ও ইংরেজি দু’ভাষায় একটি দ্বিভাষিক সংবাদপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলন তিনি। প্রকাশও হয়েছিলো। ওয়ান ইলেভেন এসে যাওয়ায় চার সংখ্যা প্রকাশের পর সেটা আর চালানো সম্ভব হয়নি। এগুলি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। তিনি নেই, আর কখনো বলার সুযোগ হবে না মনে করে এসব কথা বললাম।
এখন সমষ্টিগত প্রসঙ্গ। তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দুই পদ মিলিয়ে তিন দশকের বেশি সময় দলের বৈঠা ছিলো তাঁর হাতে। এই সময় মহানগর আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেছেন তিনি। মান্নান ভাই যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন সভাপতি ছিলেন। তবে মৃত্যুর পূর্বে তিনি সভাপতি ছিলেন না। মান্নান ভাই সভাপতি থাকলেও মহিউদ্দিনের জন্য তিনি কোন সমস্যা ছিলেন না। মান্নান ভাই ও মহিউদ্দিন ভাইয়ের রাজনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিলো। মান্নান ভাই ছিলেন ভদ্র, ন¤্র, পরিশীলিত রুচির মানুষ। স্বভাবে নরম, নম্রতাই তাঁর চরিত্রের ভূষণ ছিলো। নমনীয়তার মধ্যে যতটা কঠোরতা বা কাঠিন্য সম্ভব, তাঁর ব্যক্তিত্বে তা’ প্রতিফলিত হতো। আর মহিউদ্দিন ভাই ছিলেন জেদী, তেজি এবং গরম স্বভাবের মানুষ। এমনিতে ভদ্র, শান্ত, শিষ্টই থাকতেন, কিন্তু উল্টা-পাল্টা, বেখাপ্পা কিছু দেখলে ফুঁসে উঠতেন। অন্যায়, গর্হিত কাজ করে তাঁর কাছে পার পাওয়া যেত না। তিনি ঘন ঘন মেজাজ হারাতেন। বলিষ্ঠতা, তেজস্বিতা ছিলো তাঁর চরিত্রের ভূষণ।
দলের জন্য মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রধান অবদান হলো, বঙ্গবন্ধু হত্যার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিনি যে সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি করেছিলেন, ভারতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিরোধ যুদ্ধের অবসান ঘটলে প্রতিরোধ যুদ্ধের সৈনিকদের নিয়েই মহিউদ্দিন চৌধুরী নতুন করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আরম্ভ করেছিলেন। প্রথমে নন্দনকানন গ্রান্ড হোটেলে (এখন নেই) অবস্থান নেন, পরে দারুল ফজল মার্কেটে দলীয় পরিচয় নিয়েই কার্যালয় স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে পুরোনো দলীয় নেতা-কর্মীরা মহিউদ্দিনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করতে থাকেন। তবে তাঁর হার্ডকোর সদস্য তারাই থাকলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরোধ যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁরা এবং কিছু অনুগত ছাত্রলীগ কর্মী। এভাবে মহিউদ্দিন দল পুনর্গঠিত করে সেই দল দিয়ে চট্টগ্রাম জয় করেছিলেন। দলকে নিয়ে তিনি একদিকে প্রতিপক্ষের হুমকি, হামলা-মামলা, শাসকের রক্তচক্ষু দেখে ভীত না হয়ে, ভেঙ্গে না পড়ে সাহসের সঙ্গে সমস্ত প্রতিকূলতা প্রতিরোধ করে দলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, অন্যদিকে জনজীবনে যখন যে সমস্যা প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে, তিনি তার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে মিটিং-মিছিল, প্রতিবাদ, আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করেছেন।
তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে, তাদের সঙ্গে মিলে মিশে, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে তাদেরই একজন মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রান্তজনের সখা, ব্রাত্যজনের বন্ধু। আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি যখন দেখলাম, প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর শহীদ মিনারের পেছনের ফকির পাড়ার কোন বুড়িকে তিনি কোলে করে নিয়ে এসে শহীদ মিনারে সমবেত হাজার হাজার মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলছেন-আমার মা। বস্তির যেই বুড়িও বলছেনÑ‘আমার ছেলে’।
আমরা আজকাল ঘনঘন তৃণমূলে গিয়ে রাজনীতির কথা বলি। বোঝা না বোঝা বা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয়, আমরা বাত কা বাত বলে ফেলি। কিন্তু তৃণমূল কাকে বলে আমরা ক’জন তা বুঝি। মহিউদ্দিন চৌধুরীই তৃণমূল বুঝতেন এবং জনজীবনের গভীরে, তলানিতে, একেবারে নিচুস্তরে গিয়ে তাঁর রাজনীতির শিকড় রোপন করেছিলেন। সমাজের সবচেয়ে অববেলিত বস্তির মধ্যেও উপেক্ষিত বুড়ির সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক পাতিয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সেই বুড়ির প্রায় খোলা ঝুপড়িতে তিনি যেতেন, খেতেন, বিশ্রামও নিতেন পরিশ্রান্ত রাজনীতিক মহিউদ্দিন। সেই বুড়িকে চাল কিনে দিতেন, কাপড় চোপড়, কাঁথা দিতেন। এমন মানবদরদী নেতা, এমন মানববাদী নেতা কি আর চট্টগ্রামে আছে? বাংলাদেশেও বা ক’জন আছে? কমিউনিস্ট পার্টিতে উবপষধংং বা শ্রেণিচ্যুত হওয়া বলে একটা কথা চালু আছে। মধ্যবিত্ত, বুর্জোয়া বা পাতি বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে আগত কমিউনিস্ট পার্টি সভ্যরা জীবনভর শ্রেণিচ্যুত হওয়ার সাধনাই করেন। তা না হলে নাকি সাচ্চা কমিউনিস্ট হওয়া যায় না। মহিউদ্দিন চৌধুরী আওয়ামী লীগ না করলে হেটে হেটে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে যেতে পারতেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরী যে ড্রয়িং রুমে বসতেন, সেখানে তাঁর চেয়ারের পেছনে বই, ক্রেস্ট, শো পিস ইত্যাদি সাজিয়ে রাখার একটা আলমারি আছে। তাঁর ড্রয়িং রুমের দেয়ালে বড় করে বাঁধাই করা অনেক ছবি ঝুলানো আছে। তাতে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার ছবিও আমি দেখেছি। তাঁর নির্বাচনী দেখেছি। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক দুটি (মেয়র নির্বাচনে হ্যারিকেন, সংসদ নির্বাচনে নৌকা)। দেয়ালে দুটি প্রতীকেরও অনেক ছবি, মিনিয়েচার ঝুলানো আছে, ভালোবেসে মানুষের দেয়া উপহার। তন্মধ্যে হরিজন সম্প্রদায়ের দেয়া একটি প্রতীকী উপহার তিনি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলেন অনেক বছর। হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতি এই ভালোবাসা তিনি তাঁর নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছ থেকে পেয়েছেন। জহুর আহমদ চৌধুরীও স্বাধীনতার পর তাঁর প্রথম কন্যার বিয়েতে হরিজন সম্প্রদায়ের সর্দারদের ডেকে বলেছিলেন, দেখ বাপু, তোমাদের সঙ্গে বসে ভদ্রলোকেরা ত খাবেনা। এক কাজ করো, তোমাদেরকে আমি ছাগল, ডাল, মরিচ, মশলা দিয়ে দিচ্ছি, তোমরা নিজেরা রান্না করে ধুমধাম করে খাও। আমার মেয়ের বিয়েতে তোমরা ফূর্তি কর এটা আমি চাই।
জহুর আহমদ চৌধুরী রেস্ট হাউসের (মোটেল সৈকত) ২৩নং কক্ষে কোন বেলা দশ/বিশজন লোক না হলে খেতেন না। কোন বেলা লোক কম হলে মুখ কালো করে বসে থাকতেন। তখন ইদ্রিস বি কম (আনোয়ারা নিবাসী, জহুর আহমদ চৌধুরীর সভাসদ) বদি, বদন, নুর মোহাম্মদকে বলতেন, রাস্তায় গিয়ে দেখ, কাউকে পাওয়া যায় কিনা। তারা বের হয়ে পরিচিত কাউকে না পেলে রাস্তা থেকে অপরিচিত লোক ধরে নিয়ে আসতেন। তারপরই জহুর আহমদ চৌধুরীর মুখে হাসি ফুটতো। তিনি তৃপ্তিভরে খেতেন। তালপাতার সেপাই-কতটুকুই বা তাঁর খাওয়া। অন্যকে খাইয়েই তৃপ্তি পেতেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন স্বল্পাহারি, শেষের দিকে তো খাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্লেটে ভাত তরকারি নিয়ে নাড়াচাড়া করা; সবখান থেকে একটু একটু নিয়ে চেখে দেখা। কিন্তু গুরুর শিক্ষা অবচেতনে তাঁর মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো। খাওয়ার সঙ্গী দশ/বারোজন থাকা চাই। বাড়ির নতুন ভবনের নিচতলায় তো বড় বড় মেজবানের ডেকচি কিনে প্রতিদিন শ’/দু’শ মানুষের খাবারের স্থায়ী ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। ড্রয়িং রুমে মানুষ নিয়ে জমজমাট আড্ডা, শতাধিক মানুষকে রোজ খাবারে আপ্যায়িত করাÑ এই দরবারি অভ্যাস তিনি তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষক জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
লেখক চট্টগ্রামের সন্তান, সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বদেশ।

শোকের মাঝে
আরেক
শোক
একদিকে চলছে প্রিয় নেতাকে হারানো শোক। সে শোকে যোগ হলো বিয়োগান্তক ঘটনার বলি ১০টি তাজা প্রাণ। চট্টগ্রাম মহানগরীর রীমা কনভেনশন সেন্টারে সোমবার পদদলিত হয়ে মারা যায় এ ১০ জন। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানি উপলক্ষ্যে মরহুমের বাড়িসহ ১৩টি কমিউনিটি সেন্টারে খাবারের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আয়োজন ছিলো আসকর দিঘীর পারে এলাকায় রীমা কনভেনশন সেন্টারে।
বিবিসি জানায়, বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে খাবার দেয়া শুরু হয়। তিন দফা খাবার শেষে বেলা দেড়টার দিকে চতূর্থ দফা খাবারের জন্য কয়েকশ’ লোক জড়ো হয় সেন্টারের গেটের সামনে। একপর্যায়ে সেখানে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেলে গেট খুলে লোকজন ঢালু পথ বেয়ে নিচে নামতে গেলে দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের সবাই হিন্দু বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ। আহত প্রায় ৫০ জন। এদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। নিহতদের পরিবারপ্রতি একলাখ টাকা আর্থিক সাহায্য দেয়া এবং আহতদের চিকিৎসা খরচ বহনের তাৎক্ষণিক ঘোষণা দেয়া হয় মরহুমের পরিবার থেকে।

Recommended For You