চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুট : চলছে অননুমোদিত স্পিড ও লালবোট

সারোয়ার সুমন: মাত্র আড়াই মাস আগেই নৌ দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি হয়েছিল চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুটে। এর আগে ২০০৬ সালের ৮ জুন ইমরুল কায়েস নামে পণ্যবাহী আরেকটি নৌযান ডুবে মারা গিয়েছিলেন ১৫ জন। ব্যস্ত এই রুটটিতে নৌ দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর এমন চিত্র নিয়মিত হলেও এখনও বহাল তবিয়তেই চলছে অননুমোদিত স্পিডবোট ও লালবোট দিয়ে যাত্রী পারাপার। ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করতে বাড়ানো হয়েছে অননুমোদিত এসব নৌযানের সংখ্যা। অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদার প্রতিদিন টোল বাবদ এসব নৌযান দিয়ে লাখ টাকা আয় করলেও নিশ্চিত করছে না নিরাপত্তা। তদারকি সংস্থা বিআইডবি্লউটিসি জাহাজ ভাড়া দিয়ে রেখে এ ঘাটে যাত্রী পারাপার করে মাসে আয় করছে এক লাখ টাকা। আবার জেলা পরিষদ ঘাট ইজারা দিয়ে টোল বাবদ মাসে আদায় করছে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা। তারপরও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ ঈদে ঘরমুখো মানুষ।

বিষয়টি নিয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ সালাম বলেন, ‘যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রায় আড়াইশ’ যাত্রী ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাহাজ চালু আছে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে স্পিডবোট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো ব্যবসা না করতেও ইজারাদারকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। ঈদের পর এ রুটটি আরও নিরাপদ করতে সংশ্লিদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ বিআইডবি্লউটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার গোপাল মজুমদার বলেন, যাত্রী ও জাহাজ সংকটের কারণে সদরঘাট-গুপ্তছড়া রুটে বড় জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটে চালু রাখা হয়েছে এসটি সালাম নামের একটি যাত্রীবাহী সি ট্রাক। এটি আমরা ভাড়া দিয়ে রাখলেও ইজারাদারকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

 এদিকে নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক গত ১২ জুন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে ১৬ সদস্যের একটি মনিটরিং টিমও গঠন করা হয়। চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ রুটে যাতে অননুমোদিত কোনো নৌযান চলাচল না করে তা তদারক করতে এ টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা, বিআইডবি্লউটিসির দুটি নৌযানে প্রতিদিন কমপক্ষে দু’বার করে যাত্রী পারাপার করা, সন্ধ্যা ৬টার পর কোনোভাবেই যাত্রী পারাপার না করা, প্রতিটি নৌযানে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম পর্যাপ্ত রাখা এবং কোনো নৌযান অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও ক্ষমতা দেওয়া হয় এই টিমকে। এ ছাড়া টিমকে ২১ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঘাট তদারকি করে রিপোর্ট দিতেও বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ টিমের কোনো সদস্য কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুট পরিদর্শন করেননি বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ করতে আমরা মনিটরিং টিম গঠন করেছি। কারও কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তিনি জানান, অনুমোদিত নৌযান ও তার মালিককে শনাক্ত করতে চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ রুটে চলাচল করা সব নৌযানের মালিকের নাম-ঠিকানাও খুঁজে বের করতে মনিটরিং টিমকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, যাত্রী সংকটের অজুহাতে এই রুটে বিআইডবি্লউটিসি বড় জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে। আগে চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে সন্দ্বীপের রহমতপুর অংশে নিয়মিত চার দিন যাতায়াত করত বড় জাহাজ। সেখানে নাব্য সংকট তৈরি হওয়ায় তারা রুট পরিবর্তন করে সদরঘাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত। এ রুটে কয়েকদিন জাহাজ চালানোর পর আস্তে আস্তে তার পরিমাণও কমতে থাকে। একপর্যায়ে যাত্রী সংকটের অজুহাতে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় এ রুটের সার্ভিস। অথচ কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটে প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ হাজার যাত্রী চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপে আসা-যাওয়া করে।

সন্দ্বীপে ঈদ করতে যাওয়া খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘সদরঘাট-কুমিরা রুটে জাহাজ চালাতে চায় না বিআইডবি্লউটিসি। যাত্রী পরিবহনে মনোযোগ না দিয়ে আয়ের ওপর নজর দেওয়ায় কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটে থাকা তাদের জাহাজটিও ব্যক্তিমালিকানায় ভাড়া দিয়ে রেখেছে তারা। এ কারণে ঘরমুখো মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা করছে ইজারাদাররা।’ তিনি জানান, গত শুক্রবার জাহাজে করে সন্দ্বীপ যেতে দুপুর ২টায় ঘাটে যান। এ সময় ঘাটে বে-ত্রুক্রজ নামের জাহাজটি দাঁড়িয়ে থাকলেও যাত্রী সংকটের অজুহাতে চলাচল বন্ধ রাখে। এ জন্য বাধ্য হয়ে স্পিডবোটে করেই চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ যান তিনি।

জানা গেছে, একেকটি স্পিডবোটে ধারণক্ষমতা ছয় থেকে আটজনের হলেও এখন ১২ থেকে ১৬ জন যাত্রী নিয়ে তা উত্তাল সাগর পাড়ি দিচ্ছে। যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হলেও তার অধিকাংশই মেয়াদ উত্তীর্ণ। আবার জাহাজ কিংবা সি ট্রাক থেকে যাত্রীও নামানো হচ্ছে অননুমোদিত নৌযান লালবোট দিয়ে। এসব নৌযানের ধারণক্ষমতা ১৫ থেকে ২০ জনের হলেও জাহাজ থেকে ৩০ থেকে ৪০ যাত্রী নিয়ে এগুলো নোঙর করছে তীরে। অত্যাধুনিক কোনো জেটি না থাকায় কোমর পানিতেই মানুষকে নামতে বাধ্য করছে স্পিডবোটের চালকরা।

চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ রুটে নিয়মিত যাতায়াত করা বেসরকারি হাজেরা-তজু কলেজের শিক্ষক ফসিউল আলম বলেন, ‘আয়ের ব্যাপারে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা মনোযোগী হলেও সেবার ব্যাপারে ততটাই উদাসীন তারা। মাত্র আড়াই মাস আগে লালবোট দুর্ঘটনায় ১৮ জন মারা গেলেও নিরাপত্তার ব্যাপারে মনোযোগী হয়নি সংশ্লিষ্টরা। রহস্যজনক কারণে জনপ্রতিনিধিরাও এ ব্যাপারে নীরব।’

(দৈনিক সমকালে প্রকাশিত)