‘জরিপ হলে সন্দ্বীপের সীমানা জটিলতা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে’

 

মোশাররেফ হোসেন (খাদেম)। ‘সন্দ্বীপ সীমানা রক্ষা কমিটি, ঢাকা’র আহবায়ক। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব। জন্ম ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। চাকরি জীবনে উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিঃ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচারিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ছিলেন। সরকারী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দয়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি সরকারী চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি সন্দ্বীপের শিবের হাটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মরহুম জহিরুল হক সওদাগরের পুত্র। সাগরের বুকে সন্দ্বীপের অংশে জেগে ওঠা চরের সীমানা নির্ধারণ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে “সন্দ্বীপ” এর মুখোমুখি হন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবুল হোসেন

প্রশ্ন : সন্দ্বীপের কাছে সাগরের বুকে জেগে ওঠা নতুন চর নিয়ে আপনাদের দাবী কি ?                                          উত্তরঃ সাগরের বুকে জেগে ওঠা চর সমূহ সন্দ্বীপের অংশ। আমরা চাই অতিসত্ত্বর জরিপ কার্য পরিচালনা করা হোক। জেগে ওঠা চর যে সন্দ্বীপের মৌজা তা জরিপে প্রমাণিত হবে। এসব চর সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে সন্দ্বীপের প্রশাসনের আওতায় পরিচালিত হোক এটাই আমাদের দাবী। সকল সন্দ্বীপ বাসীর দাবী।

প্রশ্ন : উক্ত চর সমূহে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড চলছে। এব্যাপারে আপনদের বক্তব্য কি ?                                 উত্তরঃ বাংলাদেশ সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে আমরা খুশি। সরকার সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড করুক। কোন সমস্যা নেই। আমাদের দাবী হচ্ছে- জেগে ওঠা চরসমুহে সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে সন্দ্বীপের প্রশাসনিক আওতায় উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে। জেগে ওঠা চরসমূহ সন্দ্বীপের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যদি থাকে তাহলে উন্নয়নের যেকোন সুফল সন্দ্বীপের জনগণ কোনো না কোনোভাবে ভোগ করতে পারবে। চরলক্ষী, চরবাটা পি এস জরীপে সন্দ্বীপের অংশ ছিলো। কিন্তু ১৯৫৪ সালে ওইসব মৌজা সন্দ্বীপ যখন চট্টগ্রামের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয় তখন নোয়াখালী জেলার সাথে থেকে যায়। তাই সন্দ্বীপের নদী সিকস্তি ভূমিহীন জনগনকে ওই সমস্ত চরের জমি বন্দোবস্ত দেয়া সম্ভব হয়নি। এখন নতুন জেগে ওঠা চর সমূহ সন্দ্বীপের প্রশাসনিক আওতায় না আসলে সন্দ্বীপের নদী সিকস্তি ভূমিহীনরা ওই সব চরে ভূমি বন্দোবস্ত পাবেনা। তাছাড়া সন্দ্বীপ সংলগ্ন জেগে ওঠা চর সমূহ সন্দ্বীপের প্রশাসনিক আওতায় না থাকলে ওই সব চর সমূহে থাকা সন্ত্রাসীরা সন্দ্বীপে এসে অপরাধ করে চলে যাবে। সন্দ্বীপের প্রশাসন প্রশাসনিক আওতায় না থাকালে কোন ব্যবস্থা নিতে পারবে না। তাই জেগে ওঠা চর সন্দ্বীপের প্রশাসনের আওতায় থাকা একান্ত প্রয়োজন।

প্রশ্নঃ নোয়াখালী কিসের ভিত্তিতে উক্ত চর সমূহ তাদের অংশ বলে দাবী করে ?                                                       উত্তর : আমি নোয়াখালী জেলার অতিঃজেলা প্রশাসক ( রাজস্ব) হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছি। আমার জানামতে, তাদের দাবীর মূল ভিত্তি হচ্ছে সি,এস জরিপ। সি,এস জরীপের সময় সন্দ্বীপ নোয়াখালীর প্রশাসনিক অধীনে ছিল। তাই সি,এস জরীপে বর্তমান সন্দ্বীপসহ জেগে ওঠা চর সমূহের জায়গা নোয়াখালীর অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে সন্দ্বীপ চট্টগ্রামের সাথে অন্তর্ভুক্ত হলেও এই বিষয়ে আলাদা কোন জরিপ হয়নি। স্বাধীনতার পর যে জরিপ হয়েছে ওই জরিপে কেবলমাত্র চর সমূহ সাগর গর্ভে বিলীন হওয়ার পর অবশিষ্ট যা ছিলো সে ভূমিটুকু জরীপে দেখানো হয়েছে। এতে ১৯৫৪ সালে যেসব মৌজা সমূহ নিয়ে সন্দ্বীপ নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামের সাথে অন্তর্ভূক্ত সে সব মৌজা থেকে বেশ কয়েকটি মৌজা সাগর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে ঐসব বিলীন হওয়া মৌজা সমূহ বর্তমানে কথিত ঠেঙ্গারচর, জাহাইজ্জার চর সহ ছোটোখাটো চর জেগে উঠেছে। সুতরাং এইসব চর সমূহে সন্দ্বীপের দাবী সূস্পস্ট। এখানে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই।

প্রশ্ন : জেগে ওঠা চরসমূহের দাবী নিয়ে মাহামান্য হাইকোর্টে মামলা চলছে । বিচারিক বিষয় নিস্পত্তি না হলে আপনাদের দাবী কিভাবে নিস্পত্তি হবে ?                                                                                                             উত্তর : মাহামান্য হাইকোর্টে মামলা চলছে উরিরচরের অংশ নিয়ে। ঠেঙ্গারচর, জাহাইজ্জার চর নিয়ে নয়।

প্রশ্ন : আপনারা বলছেন ঠেঙ্গারচর, জাহাইজ্জার চর সন্দ্বীপের অংশ। এসব চরের কোন কোন মৌজা সন্দ্বীপের কোন কোন ইউনিয়ন ছিল ?                                                                                                                       উত্তর :  অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করে জরীপ করা হলে তখন নিশ্চিতভাবে জানা যাবে সন্দ্বীপের কোন কোন মৌজায় এই চর সমূহে জেগে ওঠেছে। তবে সন্দ্বীপের প্রবীণ মানুষেরা মনে করেন- কথিত ঠেঙ্গারচর হচ্ছে, ন্যায়ামাস্তি, সুলতানপুরসহ কয়েকটি ইউনিয়ন, জাহাইজ্জার হচ্ছে, পায়াডগি, সমসেরবাদ, কাজিরখিল, ইজজতপুর, রুহিনী সহ কয়েকটি ইউনিয়ন।

প্রশ্ন : আপনাদের দাবী নিয়ে আপনারা কতদূর অগ্রসর হয়েছেন ?                                                                      উত্তর : যেহেতু এসব দাবী সন্দ্বীপের মানুষের প্রাণের দাবী। সন্দ্বীপের জনপ্রতিনিধি আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে সম্পৃক্ত না করলে দাবী আদায় করা কঠিন। তাই আমরা আমাদের সাংসদ জনাব মাহফুজুর রহমান মিতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব শাহজাহান বিএ এর সাথে আলাপ করি। তাঁরা বেশ আন্তরিক। পরবর্তীতে মাননীয় সাংসদের মাধ্যমে মাননীয় ভূমি প্রতিমন্ত্রি জনাব সাইফুজজামান চৌধুরী জাবেদ এমপি মহোদয়ের সাথে সাক্ষাৎ করি। মাননীয় প্রতিমন্ত্রি আমাদের দাবীর প্রতি যথেষ্ট আন্তরিকতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জেগে ওঠা চর সমূহ পরিদর্শনে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তদানুযায়ি বিগত ৩০ শে মার্চ তিনি জাহাজ যোগে জেগে ওঠা চরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দূর্ভাগ্য-বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফিরে আসতে হয়। ওই সময় আমাদের পক্ষ থেকে সন্দ্বীপের সাংসদ মিতা সাহেব, সন্দ্বীপের সীমানা নির্ধারন কমিটির সদস্য সাবেক জেলা ও দায়রা জজ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, নোয়াখালির জেলা প্রশাসক ও জরীপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সহ উর্ধতন সরকারী কর্মকর্তরা সাথে ছিলেন।

প্রশ্ন :  প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আবার কবে পরিদর্শনে যেতে পারেন ?                                                                  উত্তর : যেহেতু চর পরিদর্শনে যাওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়ার কথা চিন্তা করে অমাবস্যা, পূর্ণিমা বাদে জোয়ার ভাটার হিসেব করে তিনি হেলিকাপ্টার যোগে যাবেন বলে মাননীয় সংসদ সদস্যকে জানিয়েছেন।

প্রশ্ন : সম্প্রতি সন্দ্বীপের গুপ্তছড়ায় নৌ দূর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আপনার বক্তব্য কি ?                                 উত্তর :  আমি সন্দ্বীপের একজন সন্তান, এদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে সন্দ্বীপের নৌ দূর্ঘটনায় আমার ভাইবোনদের প্রাণহানিতে আমি শোকাহত। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। যে প্রাণহানি ঘটেছে তার বিচার ও ক্ষতিপূণ দাবী করছি। আর যাতে এধরণের ঘটনা না ঘটে তার বিহীত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবী জানাচ্ছি।

প্রশ্ন : কেন এমন মর্মান্তিক দূর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন ?                                                                    উত্তর :  দেখুন আমি দীর্ঘদিন সরকারি কর্মকর্তা ছিলাম। সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে বর্তমানে হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। তিনটি সংস্থা একাজ করছে, একদিকে ইওডঞঈ, ইওডঞঅ, ও জেলা পরিষদ। একটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে যাত্রী পারাপারের কাজটি থাকা উচিত। যাদের জাহাজ আছে, ইঞ্জিনিয়ার আছে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। আর দুর্ঘটনা ঘটেছে সমন্বয় ও অভিজ্ঞতার অভাবে বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন :  ঘাট পরিচালনা নিয়ে জেলা পরিষদের বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থান দিন দিন জোরালো হচ্ছে। আপনি এটা কিভাবে দেখেন? উত্তর :  আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, বিআইডাব্লিউটিএ ঘাট নিয়ন্ত্রণ করবে। বিআইডাব্লিটিসি জাহাজের মাধ্যমে যাত্রী পারাপার করবে। এক্ষেত্রে জেলা পরিষদ কাজ করার সুযোগ নেই। আমি জেলা পরিষদের দায়িত্বে ছিলাম। জেলা পরিষদের অর্থবল, লোকবল, অভিজ্ঞতা কোনটাই নেই। তাই এই জনবহুল ঘাটটি কোন সংস্থা পরিচালনা করবে তা অতিসত্তর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে বিষয়টি সুরাহা করা উচিত। নইলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তিনটি সংস্থা সম্পৃক্ত বিধায় কার অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়ে প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রশ্ন: নিরাপদ যাত্রী পারাপারে আপনার পরামর্শ কি ?                                                                                   উত্তর:  এমন জাহাজ দরকার যা সরাসরি সন্দ্বীপের ভূমির সাথে লেগে যেতে পারে। সন্দ্বীপ চ্যানেল যেহেতু খর¯্রােতা এমন জাহাজ প্রয়োজন যা প্রতিকুল আবহাওয়াই চলতে পারে। এবং সরাসরি উভয় ভূমি অথবা জেটির সাথে লেগে যেতে পারে। উভয়কূলে যেহেতু ভাঙ্গা গড়ার প্রবনতা আছে সেহেতু ভাসমান জেটি স্থাপন করলে ভালো হয়। নতুবা বিশেষজ্ঞ দিয়ে সন্দ্বীপর চ্যানেলের চরিত্র বিশ্লেষণ করে টেকসই জেটি নির্মাণ করতে হবে।

প্রশ্ন: সন্দ্বীপের বর্তমান উন্নয়ন প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য কি ?                                                                            উত্তর : আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে অবকাঠামো গত উন্নয়ন হয়েছে বলা যায়।

প্রশ্ন: সন্দ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলবেন ?                                                                       উত্তর :  সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর থেকে আমি রাজনীতি থেকে দূরে আছি। এখন কোন রাজনৈতিক দলের সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই, তাই রাজনৈতিক বিষয়ে আমি কোন বক্তব্য দিতে অপারগ।

প্রশ্ন :  সম্প্রতি সন্দ্বীপের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি ?                  উত্তর :  ব্যাক্তিগতভাবে বলতে পারি, কোনভাবেই কোন অস্থিরতা, অশান্তি , হত্যা, সন্ত্রাস মানুষ পছন্দ করে না। জনপ্রতিনিধিদের উচিত জনগনকে সাথে নিয়ে এসব বন্ধ করা। সন্দ্বীপ শান্তির জনপদ ছিল। আমি সন্দ্বীপসহ পুরো বাংলাদেশের শান্তি চাই। কারণ, অশান্তি, সন্ত্রাস ছোঁয়াচে রোগের মতো । এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছড়ায়।

প্রশ্ন :  আপনাদের সর্বশেষ দাবী কি ?                                                                                                  উত্তর : আমাদের একটাই দাবী, সিএস জরিপের আলোকে নতুনভাবে অতিসত্তর জরিপ কাজ শুরু করা। জরিপ কাজ সম্পন্ন হলে সন্দ্বীপের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি নিস্পত্তি হয়ে যাবে।

আপনাকে ধন্যবাদ ।

আপনাকেও ধন্যবাদ ।

এসএন/এসএম।