ঢাকায় ‘চাচা – ভাতিজা’র বৈঠকে সমঝোতা!


সালেহ নোমান, উপদেষ্টা সম্পাদক (চট্টগ্রাম থেকে): দু’জনের সম্পর্ক চাচা ভাতিজার মতো। মাস্টার শাহজাহান বিএ’র সাথে রাজনীতি করেছেন সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান। শাহজাহানের হাত ধরেই উনিশ শ’ আশির দশকের শেষ দিকে রাজনীতিতে আসেন তিনি। এরপরতো, তিনি সন্দ্বীপের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।

পিতার পদাঙ্কে ছেলে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে এমপি হলেন। ২০০৬ এ বাতিল হয়ে যাওয়া নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। এরপর, ২০০৮ সালে দল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচনে গেলে মাহফুজুর রহমান মিতা। সেখানেও গড়লেন ইতিহাস। বিএনপি ওই আসনে জিতলেও মিতা ভোট পেলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে বেশি।

সন্দ্বীপের রাজনীতিতে মাহফুজুর রহমান মিতা এখন শক্ত অবস্থানে। বিএনপি’র রাজনীতি নেই। জামাতও নেই। এমনকি, নিজ দলের ভেতরের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাস্টার শাহজাহান ও জাফর উল্লাহ টিটুর অনুসারীরাও সন্দ্বীপে কোনঠাসা। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনায় হামলা মামলায় এই গ্রুপের অনেকে এলাকা ছাড়া। এমনি পরিস্থিতিতে মাঠ একাই অনেকটা মিতার দখলে।

এরপরও, কিছু ঘটনা ঘটছে। হত্যাকা-, গুমের ঘটনা আছে। সন্দ্বীপবাসী মনে করে, মাস্টার শাহজাহান কিংবা টিটুর অনুসারীরা চুপ মেরে যাওয়া মানে সন্দ্বীপে শান্তির সুবাতাস বয়ে যাবে ভাবা বোকামি।

সন্দ্বীপের রাজনীতিতে সরকারী দলের এই যে গ্রুপিং, সেটা শেষ হবে কবে? কারো কোন ধারণা নেই। নেতারা নিজেরাও নানাসময়ে এক হবার ঘোষণা দিয়ে কথা রাখেন নি। এখন দেখা যাক, মিতা শাহজাহানের সবশেষ বৈঠক কি ফল দেয়।

গত ১৫ মে বিকালে রাজধানী ঢাকায় মাহফুজুর রহমান মিতার কাকরাইল অফিসে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই নেতার এই বৈঠকের ফলে সন্দ্বীপের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ ও অবনতিশীল আইন শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২০ মার্চ উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকায় যুবলীগ নেতা বাবলুর উপর সন্ত্রাসী হামলা ও ১২মে উরির চর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরনবী মামুনের অপহরণের প্রেক্ষাপটে সন্দ্বীপ আওয়ামীলীগের দুই মেরুর দুই শীর্ষ নেতার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। তবে, বৈঠকে দুই দিন পরেই অর্থাৎ ১৮মে খুন হয়েছে পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক সোহেল রানা বাবলু।

মূলত; সন্দ্বীপ আওয়ামীলীগ দীর্ঘ দুই দশক ধরে দুই ধারায়। এক ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহাম্মদ শাহজাহান। ক’বছর ধরে অন্য ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাহফুজুর রহমান মিতা। এর আগে এই ধারার নেতৃত্বে ছিলেন মিতা’র প্রয়াত পিতা সাবেক সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান। সন্দ্বীপ আওয়ামীলীগের এই দুই ধারার কোন্দলের কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে বেশ কয়েকজন নেতা- কর্মীকে। উরির চর আওয়ামীলীগ নেতা নুরনবী মামুন অপহরণ ও পৌরসভা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক বাবলু খুনের ঘটনাও এই দুই ধারার মধ্যে বিরোধের ফল বলেই অনেকের ধারণা। এরমধ্যে মামুন শাহাজাহানের এবং সোহেল রানা বাবলু মিতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

বৈঠক প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেছেন, “আমি কাকরাইলে রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের অফিসে গিয়েছিলাম, সেখানে দুইজনের মধ্যে আলাপ হয়েছে, দলের একটি ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক মামুন অপহরন হয়েছে, আরো নেতা- কর্মীরা জেল জুলুমসহ হয়রানির শিকার হচ্ছে, এভাবে তো চলতে পারেনা, এসব নিয়ে এমপির সাথে কথা বলেছি, উত্তরণের উপায় নিয়ে ভাবতে বলেছি, মাঠ পর্যায়ের নেতা- কর্মীরা যে অবস্থায় থাকুক নীতি নির্ধারকদেরতো গঠনমুলক ভুমিকা রাখতে হবে, আমাদের এই বৈঠক মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দূরত্ব কামানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।

“এই বৈঠকের পরও দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, পৌরসভা যুবলীগের একজন নেতা নির্মমভাবে খুন হয়েছে, এসবতো হওয়ার কথা ছিলোনা, এগুলো বন্ধ করতে না পারলে আমাদেরকে বিশেষ করে দলকে মূল্য দিতে হবে, বলেন মোহাম্মদ শাহজাহান।

বৈঠকে কোন সমঝোতা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, কিছু কথা বার্তা হয়েছে এখন এসব কথা থাকে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। আসলে সবকিছু নির্ভর করবে আন্তরিকতার উপর, এমপি সাহেব কতটুকু আন্তরিকতা দিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে চান সেটা দেখতে হবে।

উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের সাথে বৈঠক প্রসঙ্গে সারাসরি কিছু বলেননি সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা।

তিনি বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান আমাদের দলের উপজেলা সভাপতি, দীর্ঘদিন দল করছেন, উনার সাথে আমার যে কোন সময় যে কোন কিছু নিয়ে বৈঠক হতেই পারে। ওনার (মোহাম্মদ শাহজাহান) সাথে আমার সব সময় যোগাযোগ আছে। দলের প্রয়োজনে আমরা সব সময় আলোচনা করে থাকি। ঢাকায় বৈঠক নিয়ে আলাদা করে কিছু উল্লেখ করার প্রয়োজন দেখি না।

আপনাদের মধ্যে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, সন্দ্বীপে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি এখন অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় ভালোই আছে, দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি নির্ণয় করা যাবেনা। বাবলু হত্যাকান্ডকে একটি পারিবারিক বিরোধ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, সন্দ্বীপে রাজনৈতিক বিরোধ তেমন নেই। অন্য কারণে যেসব ঘটনা ঘটছে সেই ক্ষেত্রে আমরা কোন অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দিচ্ছিনা। পুলিশও ভালো ভুমিকা রাখছে, খুনী অন্যায়কারী যেই হোক তাকে ধরতে হবে।

নুরনবী মামুন অপহরণ প্রসঙ্গে মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, আমি এই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি, অবিলম্বে মামুনকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেয়ার আহবান জানাচ্ছি।

এসএম।