সন্দ্বীপে যুবলীগ নেতা বাবলু খুন: নেপথ্যে ইলিশ আর ফেরিঘাট!


চট্টগ্রাম অফিস: আরো একটি খুন সন্দ্বীপে। খুন হয়েছেন একজন রাজনৈতিক নেতা। তবে কি, এটি রাজনৈতিক খুন?
যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ওরফে বতা বাবলুকে কে খুন করেছে? যুবদল? যুব শিবির? যুব সংহতি? সর্বহারা? যুব ইউনিয়ন? প্রতিপক্ষ?

তথ্য আর ভাষ্য বলছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কিংবা সংগঠনের কেউই এই নির্মম খুনে জড়িত নেই। বাবলু খুন হয়েছেন নিজের সংগঠনে প্রতিপক্ষ গ্রুপের হাতে। কেনো খুন হলেন? আমাদের যা অনুসন্ধান, তাতে স্পষ্ট যে, বাবলু খুনের কারণ রাজনৈতিক নয়, সাংগঠনিকও নয়। এটি  একটি গ্রুপের উপটর অপর গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের একটি ঘটনা।

সোহেল রানা বাবলুকে ঘিরে আসন্ন মওসুমে সন্দ্বীপের পশ্চিম অঞ্চলে ইলিশ মাছের ব্যবসার বড় পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছিলো। যাতে বিনিয়োগ করেছিলেন, অনেক নামী দামী জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী। সন্দ্বীপ পৌরসভার অভ্যন্তরের তিনটি মাছ ঘাটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণও প্রায় নিয়ে নিয়েছিলো বাবলু। তার আগেই দুনিয়া থেকে সরে যেতে হলো তাকে।

গত ১৮মে রাতে বাবলুর উপর হামলা করে দুর্র্বৃত্তরা। সকালে পুলিশ তার গলা কাটা ও গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে।
তবে, বাবলু হত্যাকান্ডের পেছনে মাছ ঘাটের দখল নিয়ে বিরোধের চেয়েও বেশি আলোচনা চলছে, তারই মামা এক সময়ের জাতীয় ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ শাহ বাঙ্গলীর ছেলে রাসেল বাঙ্গালীর বিরোধের বিষয়টি। বাবলুর পরিবারের দায়ের করা মামলায় রাসেলও তার সহযোগিদের আসামী করা হয়েছে।

শাহ বাঙ্গালীর মেয়ের জামাই হরিশপুরের জয়নাল আবেদীনের পুত্র বাবলু ছোট বেলা থেকে ডানপিটে চরিত্রের ছিলো। ২০০৯-১০ সালের দিকে সে পৌর মেয়র জাফর উল্যা টিটুর অনুসারী ছিলো। কয়দিন পরই তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বাবলু পাড়ি জমায় মধ্যপ্রাচ্যে। ২০১৪ সালের পর আবার দেশে ফিরে আসে। পৌরসভার এক ও দুই নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন মার্কেট, ঘাট ও অনান্য জায়গায় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে সে। এলাকায় তার প্রভাব প্রতিপত্তির প্রধান বাধা ছিলো প্রতিপক্ষ মেয়র টিটু গ্রুপ। কিন্তু সম্প্রতি মেয়র গ্রুপের হাতে কমপ্লেক্স এলাকায় এমপি গ্রুপের আরেক যুবলীগ নেতা লোহা বাবলু আহত হয়। এরপর থেকে টিটু গ্রুপ মোটামুটি এলাকা ছাড়া হয়ে গেলে পৌরসভা এক ও দুই নং ওয়ার্ডের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে বাবলু ও তার মামা রাসেলের হাতে। কিন্তু এক পর্যায়ে এখানেও বিরোধ দেখা দেয়। বাবলুর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে রাসেল ও মেয়র টিটুর সাবেক অনুসারী কালা মুনির। যার পরিণতিতে দুনিয়া থেকে সরে যেতে হলো বাবলুকে। মামলার আসামী হওয়ায় রাসেলও এলাকা ছাড়া।

কেন রাসেল বাবলুকে মারলো এমন প্রশ্নের উত্তরে সন্দ্বীপ পৌরসভা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল মাওলা বলেন, বাবলু ইদানিং তার পূর্বের জীবন থেকে সরে এসেছিলো. কিন্তু রাসেল ও কালা মুনির আগের মত বে-আইনী কার্যকালাপ চালিয়ে যেতো, এতে বাধা হয়ে দাঁড়ানোতে রাসেল অন্যকোন পক্ষের সহযোগিতা নিয়ে বাবলুকে সরিয়ে দিলো।

“বাবলু এলাকায় থেকে ব্যবসা বাণিজ্যে মনযোগ দিয়েছিলো, সে মাছের ব্যবসা করার জন্য কোল্ড স্টেরেজ দিয়েছিলো, ভালো হয়ে যাওয়াতে অনেকেই তাকে টাকা দিতো ব্যবসা করার জন্য, সে মাঝে মাঝে এমপি সাহেবের কাছ থেকে টাকা ধার নিতো, আমিও তাকে ব্যবসায় টাকা দিয়েছি , উল্লেখ করেন শফিকুল।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে- সোহেল রানা বাবলু সন্দ্বীপের রহমতপুর এবং হরিশপুরের ঘাটে যে বিপুল পরিমাণ ইলিশ মাছ অবতরন করে তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সে পৌরসভার এক নং ওয়ার্ডের তালুকদার বাজার ঘাট ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের আশোকের সাঁকো সংলগ্ন ঘাট ইতোমধ্যে দখলে নিয়েছিলো। এই দুইটি ঘাট থেকে খাস কালেকশানের মাধ্যমে টোল তুলতো সন্দ্বীপ পৌরসভা। সম্প্রতি পৌরসভার ইজারাদারকে জোরপূর্বক ঘাট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো সে।

এই দুই ঘাটে প্রায় শতাধিক নৌকায় কয়েক’শ মৎস্যজীবি মৎস্য আহরণ করে থাকে। ইলিশ মাছের মওসুম ছাড়াও চরাঞ্চল থেকে ‘ঘেরাও জালে’ ধরা পড়া মাছও এইসব ঘাট দিয়ে অবতরণ করে। মাছের পাশাপাশি চর থেকে আসা চোরাই পথে আসা কেওড়া গাছের লাকড়িও আসতো এসব ঘাট দিয়ে যা নিয়ন্ত্রণ করতো কালা মনির।

এক ও দুই নং ওয়ার্ডের ঘাট দখল সম্পন্ন করার পর সোহেল রানা বাবলু পৌরসভা নয় নং ওয়ার্ড রহমতপুর ঘাট দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছিলো। এই ঘাটটির গত কয়েক বছর ধরে ইজারাদার মেয়র জাফর উল্যা টিটুর একান্ত আস্থাভাজন এবিএস লিটন।

এবিএস লিটন বলেন, বাবলু এই ঘাট দখল নেয়ার চেষ্টা করছিলো কিনা আমার জানা নেই, পশ্চিমের সমুদ্রে চর পড়ে যাওয়ায় এসব ঘাট এখন প্রায় অকেঁজো। কেউ এখানে আসেনা। ব্যবসা কম হওয়ায় ইজারাদারও পাওয়া যায় না, বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকায় দৈনিক খাস কালেকশান দিচ্ছি আমরা।

বাবলু এক নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার মার্কেট ঘাট এবং ২নম্বর ওয়ার্ডের আশেকের সাকোঁ ঘাটের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলো। এই দুই ঘাটের মাছ এবং কেওড়া গাছের ব্যবসা সে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছিলো। পাশাপাশি, মেয়র টিটুর ঘনিষ্টজনদের কব্জায় থাকা নয় নম্বর ওয়ার্ডের রহমতপুর ঘাটের কেওড়া গাছের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও বাবলুর হাতে চলে এসেছিলো। মেয়র টিটুর প্রভাব কমে যাওয়ার পরপরই কালা মনির এখানে কেওড়া গাছের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতো। সম্প্রতি কালা মনিরকে হটিয়ে বাবলু এর নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে। আসন্ন ইলিশ মাছের মওসুমকে সামনে রেখে বাবলুর মাছ ব্যবসার ব্যাপক প্রস্তুতিতে ধারণা করা হয়েছিলো এটাও তার কব্জায় চলে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামীলীগের এমপি মিতার ঘনিষ্ট দুইজন নেতা বাবলু ও কালা মনিরের মাধ্যমে একটি সমঝতোও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কি কারণে এই সমঝোতা টেকেনি তার কারণ অনুসন্ধান করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই কারণটি জানা গেলে বাবলু হত্যার সুদুর প্রসারী মোটিভও স্পষ্ট হবে বলে তাদের ধারণা।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার উত্তর মসিউদ্দৌলা রেজা জানিয়েছেন, বাবলু নিজেও বিভিন্ন মামলার আসামী। তার হত্যার পেছনে ঘাটের দখল, মাছ ও গাছ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের বিরোধ কাজ করেছে। এই ব্যবসার সাথে এতদিন যারা জড়িত ছিলো, বাবলু খুনে তাদের কোন সংশ্লিষ্টতা কি সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এসএন/এসএম।