রাশিয়া কানেকশনে বেকায়দায় ট্রাম্পঃ আরেকটি ‘ওয়াটারগেট কেলেংকারি’?

রিচার্ড মিলহৌস নিক্সন হচ্ছেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।

সন্দ্বীপ ডেস্ক: ৮ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরপরই সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে মার্কিনীরা, সেইসাথে বিশ্ববাসী জানতে পারে যে, রাশিয়া এ নির্বাচন নিয়ে তেলেসমাতি করেছে। কিভাবে? রাশিয়ার প্রযুক্তিবিদরা (হ্যাকার) নির্বাচনী যন্ত্রপাতি হ্যাক করে তথ্য উলটপালট করেছে, এমন খবর দেয় মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো। আর তাতেই নড়েচড়ে বসে মার্কিন প্রশাসন। সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট ওবামা তাড়াতাড়ি এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধ করে দেয়া হয় রাশিয়ার দুটি অফিস। বহিষ্কার করা হয় ৩৫ জন রাশিয়ান কুটনীতিককে। এ সিদ্ধান্ত কিন্তু এমনি এমনি নেয়া সম্ভব নয়। ওবামা প্রশাসনের হাতে এমন কিছু প্রমাণ গেছে, যাতে করে তারা নিশ্চিত হয়েছে ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। ঘটনা তদন্তের নির্দেশও দিয়ে গেছেন ওবামা।
বলা হচ্ছে, রাশিয়ার এই জোচ্চুরির উপকারভোগী হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।

ট্রাম্প অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রেসিডেন্ট। রাশিয়া কানেকশন ইস্যুতে শেষপর্যন্ত কি তাকে নিক্সনের ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে?­­­­

রাশিয়ার সাথে তার সদ্ভাবটা কিন্ত নির্বাচনের আগে থেকেই চাউর হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবর ছিলো, ট্রাম্পের নির্বাচনী কর্মকর্তারা রাশিয়ার গোয়েন্দাদের সাথে বহুবার যোগাযোগ করেছেন নির্বাচনের আগে, প্রচারণার সময়। এ খবর বিষয়ে ট্রাম্প বরাবরই সংবাদমাধ্যমকে একহাত দেখিয়েছেন। তাদের বলেছেন মিথ্যেবাদী। মার্কিন জনগণের শত্রু। নিজের সংবাদ সম্মেলন থেকে সাংবাদিককে বের করে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে। এতো আগ্রাসী প্রেসিডেন্টের দেমাগের আস্তরণ কিন্তু আস্তে আস্তে খসে পড়তে শুরু করে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে মাইকেল ফ্লিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে।

 

লে. জে. মাইকেল ফ্লিনকে নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদটা ছাড়তে হয়েছিলো চেয়ারে বসার মাত্র ২৪ দিনের মাথায়, বাধ্য হয়েই। রাশিয়া কানেকশনের অন্যতম বলি তিনি।

ফ্লিন নির্বাচনী প্রচারণার দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠক করেছিলেন বলে খবরে প্রকাশ। সে দায় নিয়েই তার পদত্যাগ। সেখানেই থেমে যায়নি কাহিনী। এরপর, একে একে নানা ঘটনা। সবশেষ, লঙ্কা পুড়বার জন্যে তৈরি আরেক হনুমান। তিনি জেফ সেশনস, এটর্নি জেনারেল। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রাশিয়া কানেকশনের। তিনি দু’বার কথা বলেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের সাথে, এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। আর এই সাক্ষাত হয়েছে নির্বাচনী সময়ে। বুঝুন তার অবস্থা। তিনিও যাই যাই করছেন। নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির আইন প্রণেতাদের অনেকেই সেশনসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরাতো আছেনই। সাথে আছে তদন্ত দল। রাশিয়া কানেকশন এটুকুতে সীমাবধদ্ধ থাকে নি। সবশেষ, এতে সংযোজিত হয়েছেন ট্রাম্পের মেয়ের জামাই জারেড কুশনার। তিনি আবার প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা। এর আগে ছিলেন শ^শুরের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটিতে। মাইকেল ফ্লিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে খানিকটা ভাটা পড়েছে ভাবা হলেও ‘রাশিয়া কানেকশন’ আবার মাথাচাড়া দিলো এটর্নি জেনারেল আর প্রেসিডেন্টের সিনিয়ির উপদেষ্টার রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠককে ঘিরে। আর, এই পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য।
ট্রাম্প শুরু থেকেই এসবকে ডেমোক্র্যাটদের চাল বলে আসছেন। বলেছেন, তারা নির্বাচনে হেরেছে। বাস্তবতাকেও হারিয়েছে। এ কারণে, নিজেদের মুখ রক্ষা করতে একের পর এক কা- করছে তারা। এদিকে, নিজের লোকদের রাশিয়া কাহিনী নিয়ে আলোচনা সমালোচনা থামাতে নতুন তরিকা এস্তেমাল করেছেন প্রেসিডেন্ট। ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর চাক শুমারের পুরনো এটি ছবি ব্যবহার করে ট্রাম্প টুইট করেছেন।

ট্রাম্পের মেয়ে জামাই, সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি জারেড কুশনার। প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে আছেন।

বলেছেন, শুমার ২০০৩ সাথে পুতিনের সাথে যে বৈঠক করেছেন, এর কারণ কি তা অনুসন্ধান করে দেখা উচিত আমাদের। শুমারের লোকজন বলছে, মুলত নিজের লোকজনের রাশিয়া প্রীতির ঘটনা থেকে অন্য দিকে দৃষ্টি ফেরাতে এই আয়োজন। শুমার জবাবও দিয়েছেন টুইটে। তিনি বলেছেন, তাদের সাক্ষাত ছিলো প্রকাশ্যে, সংবাদমাধ্যমের সামনে। শুমারের প্রশ্ন, ট্রাম্প কিংবা তার লোকজনের বৈঠক কি সেভাবে হয়েছে?
ট্রাম্পের পক্ষে রাশিয়া কলকাঠি নেড়েছে। এ দাবি নাকচ করে দিলেও ট্রাম্প কিন্তু রাশিয়ার বিপক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করছেন না। বরং, দেশটির বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কিভাবে শিথীল করা যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন।
পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটেই বলা যায়। এটি কোন রাষ্ট্রীয় ইস্যু নয়। পুরোপুরি ট্রাম্পেরই ব্যক্তিগত বিষয়। ব্যক্তিগত স্বার্থজড়িত সম্পর্ক। স্বাভাবিক কারণে, সবদিক থেকে চাপটাও সেভাবে পড়ছে ট্রাম্পের ওপর। অভিবাসন নিয়ে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে। সেটা নিয়ে চাপে আছেন তিনি। চাপ আছে আরো নানা বিষয়ে। সব মিলে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি ট্রাম্প। রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এখনকার পরিস্থিতিতে ১৯৭২ সালের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ছায়া দেখতে পাচ্ছেন তারা। প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে গিয়ে

ভারপ্রাপ্ত এটর্নি জেনারেল শ্যালি ইয়েটস প্রেসিডেন্টের অভিবাসী বিষয়ক নির্বাহী আদেশের পক্ষে আদালেতে না দাঁড়াতে না চাওয়ায় তাকে সরিয়ে সে পদে নিয়োগ দেয়া হয় জেফ সেশনসকে। এখন, আবার সেশনসের ভবিষ্যৎই টলমল করছে।

শেষপর্যন্ত ক্ষমতা হারাতে হয়েছিলো প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে। মার্কিন প্রচার মাধ্যমে কোন কোন রাজনীতি বিশ্লেষক সব ঘটনার পূর্বাপর তুলে ধরে এরই মধ্যে প্রশ্ন রেখেছেন, ট্রাম্প কি তাহেল আরেকটা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জন্ম দিতে যাচ্ছেন।
নিক্সন রিপাবলিকান ছিলেন, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর নির্বাচনী কৌশল জানতে আঁড়ি পাততে চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরো গুরুতর। চিরশত্রু রাশিয়াকে ব্যবহার করেছেন নির্বাচনী ফলাফল হ্যাকিংয়ে। এফবিআই তদন্তে নেমেছে। ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতারা এরই মধ্যে এফবিআই প্রধানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনেছেন। রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা না থাকলে আরো আগেই এ বিষয় ধামাচাপা পড়ে যেতো। বার বার যখনই এ বিষয়ে নতুন নতুন ঘটনার জন্ম হচ্ছে, খুব সহজে এটি শেষ হবার নয়। তদন্তে নেমেছে অনেক সংস্থা। যে নিউ ইয়র্ক টাইমস আর সিএনএন এ বিষয়ে অনেক তথ্য ফাঁস করেছিলো, বসে নেই তারাও। এমনও হতে পারে, জড়িতদের কেউ একজন মানসিক চাপ সইতে না পেরে একসময় সত্যটা প্রকাশ্যে বলে বসবেন, যেমনটা করেছিলেন নিক্সনের এক সহযোগী। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি শেষ হতে লেগেছে দুই বছরেরও বেশি সময়। দেখার পালা, রাশিয়া ইস্যু কিভাবে সামাল দিতে পারেন ট্রাম্প। আর কতদূর যেতে পারে এই ঘটনা, সেটিও দেখার অপেক্ষায় বিশ^বাসী। এ ইস্যুর সমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনে অস্থিরতা কাটবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।