মানবিক হলেও ঠ্যাংগার চরে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ঝুঁকিপূর্ণঃ বিশেষজ্ঞদের মত

মাইনুল পিন্নু: রোহিঙ্গাদের ঠ্যাংগার চরে পুনর্বাসনের উদ্যোগে দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশে ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট তিন রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ। এ সময়ে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত এ ইস্যু নিয়ে ’সন্দ্বীপ’ কথা বলেছে তাদের সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক শান্তুনু মজুমদার বলেছেন, রোহিঙ্গা পুনর্বাসন মানবিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু, দেশের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, পুনর্বাসন যেন তাদের মধ্যে নতুন কোন ক্ষোভ কিংবা চাহিদার জন্ম না দেয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে সরকারকে।
অপরাধ বিজ্ঞানী ফারজানা রহমান মানবিকতার বিষয়টি তুলে ধরলেও দেশের নিরাপত্তা, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদে রোহিঙ্গাদের জড়িয়ে পড়া কিংবা জড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন। তার মতে, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া মিয়ানমার সরকারকে আরো ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে উৎসাহিত করতে পারে। তিনি মনে করেন, অবকাঠামো ও ভৌগলিক কারণে চর এলাকায় রোহিঙ্গারা অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। রোহিঙ্গাদের বিগত সময়ের অপরাধপ্রবণতার কথা উল্লেখ করেন এ অপরাধবিজ্ঞানী বলেন, এরা নানা কারলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধকর্মেও সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী পাসপোর্টে গিয়ে সেখানে নানা অপরাধে জড়িয়ে বাংলাদেশেরই ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে তারা। এখনো করছে। ফারাজান রহমানের আশঙ্কা, পুনর্বাসিত হলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের তাদের একটা স্থায়ী ঠিকানা গড়ে উঠবে আর ওপারে থাকা তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগযোগের মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ আর মাদক চোরাচালানের নেটওয়ার্ক। তার মতে, রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে সরকারের মুল কাজ হবে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বিষয়টিকে তুলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় রাখার পক্ষে মত দিলেও বললেন, এটা করতে হবে তাদের জন্য বসবাসের অবকাঠামো নির্মাণের পর। দূর্গম চরে আইনশৃংখলা বাহিনী রোহিঙ্গাদের কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, স্থানটি সমুদ্র উপকূল হওয়ায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির পরিমাণ বেশি থাকবে। নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি রোহিঙ্গাদেরকে ব্যবহার করছে উল্লেখ করে বিষয়টিতে বেশী নজর দেয়ার কথা বললেন তিনি। আবেগের চেয়ে নিরাপত্তা, বাস্তবতা আর ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেয়ার মত এ তিন জনের।
রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ইস্যুতে খোদ সরকারী দলেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সরকারী সিদ্ধান্ত পুনর্বাসনের পক্ষে থাকায় স্বাভাবিক কারণে এটি প্রধামমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থনপুষ্ট প্রকল্প। এ কারণেই, সরকারী দলের কোন নেতা রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিপক্ষে নিজেদের মত প্রকাশ করতে চান না। অন্য যে কোন বিষয়ে তারা ঢালাও এমন লাগামহীন মন্তব্য করলেও রোহিঙ্গা পুনর্বাসন নিয়ে কোন কথাবার্তা নেই তাদের। যাদের পুনর্বাসনের কথা বলা হচ্ছে সেই রোহিঙ্গারাও এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। চরে পুনর্বাসনে সম্মতি নেই তাদের। নোয়াখালী জেলার মানুষও এ নিয়ে আন্দোলনমূখর। রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের পক্ষে নেই সন্দ্বীপের মানুষও। সরকারী দলের অনেক সিনিয়র নেতার সাথে কথা বলে বোঝা গেছে, তারা রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ইস্যুতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছরের মধ্যে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নামে। শুরু করে ইসলামি জিহাদ। মংডু ও বুছিডংসহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারী অফিস আদালতে হামলা করে, অমুসলিমদের হত্যা করে। সশস্ত্র মুজাহিদরা চেয়েছিল নাগরিকত্ব না নিয়ে রাখাইন প্রদেশ নিয়ে দেশভাগের সময় পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে।
সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাস আর উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশের আসা রোহিঙ্গাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছে রাবেতা নামের একটি এনজিও, যেটি আসলে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সেদেশে নাগরিক মর্যাদা দেয়নি। কেনো দেয়নি এ বিষয়ে নানা মত। মিয়ানমারের সরকার মনে করে, এই জাতিগোষ্ঠী কখনো তাদের দেশের প্রতি অনুগত ছিলো না। তাই, সেদেশের নাগরিক হবার যোগ্যতা রাখে না। বাংলাদেশের সরকারী দলের সিনিয়র কোন কোন নেতা মনে করেন, এখানে তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হলে, মিয়ানমার সরকারের এ দাবি প্রতিষ্ঠা পাবে। আরো যেসব রোহিঙ্গা এখনো সেখানে আছে, তাদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া আরো জোরদার হবে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের পক্ষে তেমন কোন জোরালো বক্তব্য নেই। বিভিন্ন সময়ে এরা কক্সবাজার ও এর আশপাশের অঞ্চলে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ার তথ্য আছে সরকারের কাছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গী প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছে রোহিঙ্গা যুবকরা। কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে এরা নানা উস্কানিতে লিপ্ত। বাংলাদেশী পাসপোর্টে এরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গিয়ে সেখানে নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত। এতে দোষ পড়ছে বাংলাদেশী নাগরিকত্বের।
এমন একটি বিপন্ন অথচ বিপদগামী জাতিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের মুল জন¯্রােতের সাথে মিশিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবসম্মত হবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এ পরিস্থিতিতে, রোহিঙ্গাদের নিজ জায়গায় পুনর্বাসন করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে মনে করেন না অনেকেই।
একারণে, ঠ্যাংগার চরে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন করে জাতীয় নিরাপত্তাসহ নানা ইস্যুতে নতুন চ্যালেঞ্জ ৈ তৈরি না করার পরামর্শ নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সমাজ বিজ্ঞানী ও রাজনীতি বোদ্ধা মহলের। বরং, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক লবিং করে এর স্থায়ী একটা সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি বলে মনে করেন সবাই।
তাদের মতে, রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে সরকার ভালো অঙ্কের অনুদান পাবে হয়তো। এতে, দেশের উন্নয়ন হবে প্রচুর। কিন্তু, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আর সামাজিক পরিবেশের যে ক্ষতি হবে, সেটা কখনো পূরণ হবে না।