নাটের গুরু এবং রুশ-মার্কিন সম্পর্ক

বিশেষ প্রতিনিধি: উনিশ শ’ নব্বুইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছিলো কিভাবে? যেটি কিনা পরাক্রমশালী, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একটি রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্তত চারদশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রীতিমতো যন্ত্রণার কারণ ছিলো! পঞ্চাশ, ষাট কিংবা সত্তরের দশকে আমেরিকার রাজনীতি, কুটনীতিকে ঘিরে ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন, যে দেশটির সাথে স্নায়ুর একটা যুদ্ধ সবসময় লেগেছিলো মার্কিনীদের। মার্কিনী মানে, তাদের সরকার জনগণ দুটোই।
বিশ^জুড়ে সচেতন আর মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষগুলোর বেশিরভাগই মনে করে, সোভিয়েত ইউনিয়নের এই করুণ পরিণতি হয়েছিলো যে মিখাইল গর্বাচেভের হাতে, তিনি আসলে পুতুল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের। গর্বাচেভ সোভিয়েতের রাষ্ট্রনায়ক হয়েও কাজ করেছিলেন মার্কিন সংস্থা সিআইএ’র হয়ে।
মানুষের বিশ্বাস যাই হোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, যাদের অনেকেই আর মস্কোর সাথে সদ্ভাব রাখায়ও বিশ^াসী নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা ছিলেন, তারা বেদনাহত হয়েছেন। স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কোটি কোটি বিপ্লবীর।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছিলো কেনো? সেদেশের জনগণকে গণতন্ত্রের স্বাদ পাইয়ে দেয়ার জন্য। মার্কিন প্রশাসনের তখন সোজাসাপ্টা যুক্তি ছিলো, রাষ্ট্র ব্যবস্থা অবারিত করতে হবে। মানুষকে ভাবতে দিতে হবে। তাদের স্বাধীন চিন্তা করতে দিতে হবে। সব কিছুতে স্বাধীনতা থাকতে হবে। সরল ভাষায়, গণতন্ত্রের পক্ষে সাফাই ছিলো তাদের। কিন্তু, বিশ^জুড়ে কি এমন একজন কেউ আছেন যিনি বলতে পারেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ধংসের দুয়ার থেকে কোন দেশ ফিরে এসেছে? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর পর পূর্ব ইউরোপজুড়ে যে যুদ্ধ আর হানাহানি, তা সহজে ভুলে যাবার নয়। ওই অঞ্চলে এখনো অস্থিরতা রয়ে গেছে। সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের নিয়ন্ত্রিত, শালীন জীবনযাপন থেকে মুক্ত হয়ে অবাধ আর উদ্দাম পরিবেশে ঢুকে নিজেদের মধ্যে হানাহানি, দলাদলি, সাম্প্রদায়িকতা, দূর্নীতি আর ইর্ষার যে বিষবাষ্প ঢুকে গিয়েছিলো সাবেক সোভিয়েতের বলয়ে সেটি কতো ভয়ঙ্কর হতে পারে তা দেখেছে বিশ^বাসী।
সমাজতন্ত্র ভালো কি খারাপ এখানে আলোচ্য নয়। যা ভালো বলে নিত্য প্রচার করছিলো যুক্তরাষ্ট্র, সেই গণতন্ত্রে ফিরে পূর্ব ইউরোপের দেশে দেশে চেপে বসে নিরাপত্তাহীনতা। দূর্নীতি। বিশ^জুড়ে গণতন্ত্রের সওদা আসলে মার্কিনীদের নব্য-সা¤্রাজ্যবাদী কৌশল। ব্রিটেনের সূর্য ডুবে যাবার পর, সা¤্রাজ্যবাদের নতুন সূর্য উদিত করার মানসে এগিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম বিশ^যুদ্ধের পর আর কোন যুদ্ধ বিগ্রহে নিজেকে না জড়ানোর ঘোষণা, প্রতিশ্রুতি আর সংকল্প- সবই ছিলো মার্কিন প্রশাসনের। কিন্তু, এরপরও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে জড়িয়েছে দেশটি। এবং এরপর থেকে পরম পরাক্রমশালী হয়ে ওঠার চেষ্টা তাদের। বাধ সাধে সেসময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে সেময় যদি সোভিয়েতের বলয় বিশ^জুড়ে না থাকতো, তাহলে বিশ্ব ইতিহাস ভিন্ন রকমের হতে পারতো। বিশ^রাজনীতিতে একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছে সোভিয়েতের শক্তি। যতোদিন তারা দূর্বল হয়নি, যুক্তরাষ্ট্র অদমনীয় হয়ে উঠতে পারেনি। এ কারণে, দেশটির আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার পেছনে সময় আর অর্থ ব্যয়ের বেশিরভাগ ছিলো সোভিয়েট আর এর বলয়ভুক্ত দেশগুলোর পেছনে। এসব দেশে গণতন্ত্র-জাগরণের পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন সংস্থা সিআইএ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিক ছিলো ন্যাক্কারজনক এবং তারা ছিলো পাকিস্তানের পক্ষে। পাকিস্তানের পক্ষে নিজেদের যুদ্ধজাহাজ ‘সপ্তম নৌবহর’ পাঠিয়ে সেটি আবার ফেরত আনতে বাধ্য হয়েছিলো তারা সেসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ভারতের চাপে।
আমেরিকা গণতন্ত্র চায়, বাক স্বাধীনতা চায়, মানুষের সামাজিক মুক্তি চায়। একাত্তরে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের সেই চাওয়ার হিসেব অন্তত আমরা মেলাতে পারি। তারা মুক্তিকামী বাঙালির কেমন মুক্তি চেয়েছিলো। তারা কেমন সামাজিক নিরাপত্তা চেয়েছিলো আমাদের। নাকি, প্রতিবেশি ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধে আমাদের সহায়তা দিচ্ছিল বলে, তারা আমাদের শায়েস্তা করে সাহায্যদাতাদের কোন বার্তা দিতে চেয়েছিলো (বৌকে মেরে ঝিকে শাসানো)।
আমেরিকা যেখানে গেছে, একটা সমস্যা তৈরি করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে তারা একটি দেশে ঢোকে। আর সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের বাণিজ্যস্বার্থ প্রবেশ করায়। অস্ত্র হোক, নিরাপত্তা প্রযুক্তি হোক কিংবা উপদেশক সেবা। শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা না করেও একটা দেশের সাথে বাণিজ্য করা যায়। আমেরিকা তার মিত্রদেশের জন্যও বাণিজ্য ক্ষেত্র খুঁজে দেয় একই কায়দায়।
সারাবিশে^ যেখানে যেখানে হানাহানি আছে, যুদ্ধ আছে সেখানে আমেরিকা আছে। পাকিস্তানে সামরিক গোয়েন্দাদের রাডার আর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে মার্কিন সেনারা ওসামা বিন লাদেনকে ধরে খুন করতে পারে। অথচ, নাইজেরিয়ার বোকো হারামের কবল থেকে ২৫০ জন্য নিরীহ অপহৃত কিশোরী, যুবতীকে উদ্ধার করতে পারে না। বন্ধ করতে পারে না সেখানকার হানাহানি।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে, রাতের আঁধারে ঘুমন্ত প্রেসিডেন্টকে তার প্রাসাদ থেকে হেলিকপ্টারে তুলে আনার কাজটি কিন্তু আমেরিকায় করেছে। পানামার প্রেসিডেন্ট নরিয়েগার সেই ঘটনায় জোরালো প্রতিবাদ হয়নি। নিজেদের ভাষায় একজন  স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে সরাতে অন্তত ১০ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হয়েছে আমেরিকাকে। সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের পর কি ইরাকে দুধের নহর বয়ে যাচ্ছে? কিংবা গাদ্দাফীকে খুনের পর লিবিয়ায় কি এখন শান্তির সুবাতাস বইছে? আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত সরকারকে উৎখাত করতে তৈরি করা হয়েছিলো জঙ্গী গ্রুপগুলো তা থেকে তৈরি হয়েছে তালেবান আর ওসামা বিন লাদেন।
যুক্তরাষ্ট্র আসলে যেখানেই হাত দিয়েছে, তাতে যতো না গণতন্ত্র আর মানবাধিকার রক্ষার ইচ্ছে ছিলো, তার চেয়ে বেশি ছিলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা। এ কারণে, পৃথিবীর দেশে দেশে মার্কিন হস্তক্ষেপে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার রক্ষার বদলে তৈরি হয়েছে পুঁজিবাদ আর সা¤্রাজ্যবাদের নতুন এক মিশেল। নিউ-লিবারেলিজম। এটি আসলে সা¤্রাজ্যবাদেরই আধুনিক একটি ধারা। এ ধারায় যোগ করা হয়েছে বিশ্বায়নকে, যাতে পূঁজিবাদের মচ্ছব চলছে। আমেরিকা এই তরিকাকে ব্যবহার করে নিজেদের পুঁজির স্বার্থ এদেশ থেকে ওদেশে স্থানান্তর করেছে নিজেদের ইচ্ছেমতো।
উনিশ শ’ নব্বুইয়ের দশকের পর বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যে বৈরিতা, সেটি এক ঝাপটায় যেনো উবে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে খান খান মার্কিন চালে। মার্কিনীদের আর আটকায় কে? সোভিয়েতের রাজধানী মস্কোকে ঘিরে গড়ে উঠলো নতুন রাষ্ট্র রাশিয়া। সোভিয়েতের অনেক কিছু থেকে গেছে তাদের হাতে। মেধা, প্রযুক্তি, সম্পদ। শুধু সীমানা আর সমাজতন্ত্র নেই। তাতে কি? রাশিয়া নিজেদের গোছাতে কতো সময় লেগেছে? ১০ বছর?
১০ বছরের ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। পাল্টে গেছে দৃশ্যপটও। এরপর থেকে উত্থান শুরু তাদের। স্নায়ু যুদ্ধের দিনগুলোতে যে আমেরিকা মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর, এখন রাশিয়া যেনো সেই প্রতিশোধ নিচ্ছে। বছরের পর বছর, সিআইএ মস্কোর খোলনলচে পাল্টে দেয়ার যে সংগ্রাম করেছে, তা নস্যি হয়ে গেছে রাশিয়ার সবশেষ চালের কাছে। গোটা মার্কিন নিরাপত্তা বিভাগ এবং প্রশাসন নড়েচড়ে বসেও যেনো কিনারা করতে পারছে না, কোথা থেকে কি হয়ে গেলো। আসলে কি করেছে রাশিয়া?
বলা হচ্ছে, রাশিয়া ট্রাম্পের হয়ে কাজ করেছে। সেসময় মার্কিন প্রশাসনে ট্রাম্প কিংবা রিপাবলিকান প্রভাব ছিলো না। ক্ষমতা ছিলো ডেমোক্র্যাটদের হাতে। রাশিয়ার গোয়েন্দা হ্যাকাররা সেই ডেমোক্র্যাট প্রশাসন, পৃথিবীর সেরা আতঙ্ক সিআইএ কিংবা এফবিআইয়ের মতো ঝানু গোয়েন্দা বিভাগের সব পাহারাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দখল নিয়েছিলো মার্কিন নির্বাচনী ডাটাবেস। ভাবতেই কেমন জানি লাগে! এও কি সম্ভব?
যদি সত্যি সত্যি তাই হয়ে থাকে (অবিশ^াস বা সন্দেহ করার কারণ খুব একটা নেই যদিও) তাহলে বলতে হয়, আমেরিকার মোড়লীপনার কি দিন শেষ হচ্ছে? সব কিছুতেই নাটের গুরু হয়ে ওঠার সেই পথ কি রুদ্ধ হতে চলেছে তাদের? রাশিয়া কি ট্রাম্পের হয়ে কাজ করে আমেরিকার প্রশাসন আর জনগণকে কোন বার্তা দিতে চাইলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের?
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে, বিশেষ করে সিরিয়ার যুদ্ধেদ্ধ রাশিয়া যেভাবে একক সিদ্ধদ্ধান্তে প্রেসিডেন্ট বাসারকে সমর্থন দিয়ে আইএসকে হঠিয়ে দিলো, তাতে আমেরিকার মুখে চুনকালি। কারণ তারা মাসের পর মাস আক্রমণ করে যে কার করতে পারেনি, রাশিয়া সেটা করেছে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে। আর এসবের মধ্য দিয়ে বিশ^মোড়লের প্রভাবে খানিকটা হলেও দাগ লাগছে। এখন দেখার অপেক্ষায়, কতোদিন আর তাদের একক গুরুগিরি থাকে।