‘জান দেব, তবু চর দেব না’

সরওয়ার আলম, সন্দ্বীপ থেকে ফিরেঃ মো. গোলাম তোয়াহার আদি নিবাস ছিল সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নে। বয়স এখন ৮২ বছর। ২৮ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের বেড়িবাঁধে জেগে উঠা ভূমি রক্ষা পরিষদ এর ব্যানারে মানববন্ধনে অংশ নিলেন জীবন সায়াহ্নের এই বৃদ্ধ। মুখে ছিলো দাবি একটাই, ‘জান দেব তবুও চর দেব না’। এভাবে, আজিমপুর, মাইটভাঙা সারিকাইত, ইউনিয়নের প্রায় দশ হাজার মানুষ তার মতো এ মানববন্ধনে অংশ নিয়ে দাবি তোলেন ঠ্যাংগারচর তাদের বাপ দাদার ভিটে নদী গর্ভে বিলীন হওয়া সেই ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন।
প্রতিবাদ সমাবেশে আনা মানুষজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৫৪ সাল থেকে ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নটি পর্যায়ক্রমে ভাঙতে ভাঙতে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় । গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে ওই এলাকায় যেভাবে চর জেগে উঠেছে, তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেটি সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
বিস্তীর্ণ এলাকায় জমায়েত হয়েছিলো সব মত, পথ, পেশা আর বয়সের মানুষ। বাদ যায়নি স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। তাদের সবার দাবি ছিলো অভিন্ন, ঠ্যাংগার চর সন্দ্বীপের অংশ এবং এটিকে সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রাণ যাবে প্রয়োজনে, তবু এ চর অন্য কোন অঞ্চলের মালিকানায় দেয়া হবে না বলেও শ্লোগান দেয় সমবেত জনতা।
সারিকাইত ইউইনিয়নের বাসিন্দা এ কে এম ফয়েজ (৭০) মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ‘সন্দ্বীপ’কে জানান, তার পুরনো বাড়ি ছিল ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নে। সেখানেই তার জন্ম। নদী গর্ভে সেই বাড়িঘর বিলীন হওয়ার পর সারিকাইতে বসতি স্থাপন করেন তারা। বাপদাদার সেই ভিটেমাটি আবার জেগে ওঠার কারণে আবার আশায় বুক বেঁধেছেন তিনি। তার স্বপ্ন, আবার ফিরে যাবেন নিজের ভিটায়। দাবিও করলেন সেটা।

মোহাম্মদ ফাহাদ নামের আরেক বাসিন্দা দলিলসহ মানববন্ধনে হাজির হয়ে বলেন, আমার কাছে আমার বাপ দাদার সম্পত্তির সেই দলিল এখনো আছে। তার মতে, ঠ্যাংগার চর বলা হচ্ছে যাকে, সেটি আসলে তার বাপদাদার ভিটেমাটির ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন।
আজিমপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিষ্ণুপদ রায় বলেন, ঠ্যাংগার চওে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার আগে ভিটেমাটি হারা সন্দ্বীপবাসীর কথা আগে ভাবা উচিত সরকারের। তিনি জানান, সন্দ্বীপের হাজার হাজার পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এই বিষয়ে জেগে উঠা ভূমি রক্ষা পরিষদের আহবায়ক মাইটভাঙা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লায়ন মো. মিজানুর রহমান ‘সন্দ্বীপ’কে বলেন, সরকার রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করুক আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু, জেগে ওঠা চরটা যে সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন, সেটা যে হাতিয়ার নয় এ বিষয়ে স্বীকৃতি দিতে হবে। এটা আমাদের দাবি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, রোহিঙ্গারা এ চরে পুনর্বাসিত হলে বিভিন্ন অপরাধমুলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সারিকাইত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম পনির বলেন, আমরা আগে ঠ্যাংগার চরকে সন্দ্বীপের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি চাই। ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন হিসেবে এটিকে সন্দ্বীপের সাথে সংযুক্তর করা হয়েছে দেখতে চাই।

সন্দ্বীপের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সদস্যসহ প্রায় হাজার খানেক মানুষ নিয়ে ২০ টি ট্রলারে মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১.৩০ মিনিটে সন্দ্বীপের সারিকাইতের বাংলাবাজার ঘাট থেকে রওনা হয়ে দুপুর ২ টার দিকে ঠ্যাংগার চরে গিয়ে পৌঁছে। সাথে ছিলো সাংবাদিকের একটি দল। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের সময় চরের খালে ৬ থেকে ৮ ফুট গভীর পানি থাকলেও ভাটার সময় প্রায় ভূমি ভেসে উঠে । ২৫ কি.মি. দৈর্ঘ্য এবং ১২ কি.মি. প্রস্থের প্রায় ৩শ’ বর্গ কি.মি. আয়তনের এ চর। সেখানে সমতল জায়গার পাশাপাশি আছে বন বিভাগের লাগানো লোনাপানি উপযোগী গাছপালা। গবাদি পশুর পায়ের ছাপ দেখে বোঝা যাচ্ছিল সেখানে এগুলো পালন করা হচ্ছে। জেগে উঠা ভূমি রক্ষা পরিষদের পক্ষ থেকে ওইদিনই চরটিকে সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন উল্লেখ করে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়, যেটি পরে নোয়াখালী জেলা প্রশাসন সরিয়ে ফেলেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।