বিদেশীর চোখে বাংলা ভাষা এবং আমরা

আন্না কোক্কিয়ারেল্লা। ইতালীয় নাগরিক। রোমে থাকেন। বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর গবেষণা সুফিবাদ নিয়ে। ৬ বছর ঢাকায় ছিলেন পড়াশোনা আর গবেষণার কাজে। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি  লিখেছেন ‘আমার দেখা বাংলাদেশ’। সেই বই থেকে অংশ বিশেষ ‘সন্দ্বীপ’ এর পাঠকদের জন্য।

 

ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি ২০০৬, রাত ১২:৪০

খুব অন্যরকম একটা দিন। আজ ঢাকার চ্যানেল আরটিভি থেকে সাক্ষাতকার নেবেন তাদের সাংবাদিক সোহেল মাহমুদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটে কিছু শুটিং করে, কলা ভবনের সামনে গিয়েছি।

রিপোর্টার প্রশ্ন করলেন, আমি কেন বাংলাদেশে এলাম এবং কেন বাংলা পড়ছি। তাকে বলেছি, প্রথম কারণ হলো ইতালিতে বাঙালি যারা আছে, তারা ইতালিয়ান বলতে পারে না, মনে হয় চায়ও না। ১০-১৫ বছর ইতালিতে থাকার পরেও পারে না। আমার কাছে খুবই অদ্ভূত লাগে, তবে এটাই বাস্তবতা। তারা আমাদের ভাষা বলতে না পারার কারণে আমাদের থানায় বা কোর্টে খুব ঝামেলা হয়। আমি দুটো পক্ষকে (মানে বাঙালি আর আমাদের সরকার) সাহায্য করতে চাই। তার ওপর, আমি বাংলা ভাষা খুব পছন্দ করি। বাংলা ভাষার ইতিহাস পড়ে এর প্রেমে পড়ে গিয়েছি বলা যায়। যে ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে বাঙালিরা প্রাণ দিয়েছেন, যে ভাষায় কথা বলার জন্য, যে ভাষাকে সরকারীভাবে মাতৃভাষা বানাতে মানুষ মরেছে, নিঃসন্দেহে সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ একটি ভাষা। সেই ভাষা আমি শিখতে চেয়েছি। সেই ভাষায় আমি কথা বলতে চেয়েছি। এসব কারণে বাংলাদেশে আসা।

কিন্তু, এ দেশে এসে দেখছি, সবাই ইংরেজি নিয়ে আগ্রহী, বাংলায় কম বলতে চায়, অন্তত আমার সাথে, একজন বিদেশীর সাথে। আসলে যখন কেউ আমার সাথে প্রথমবার কথা বলে, স্বাভাবিকভাবে ইংরেজি দিয়ে শুরু করে। কিন্তু, আমি বাংলা বুঝি এবং বলতেও পারি বলার পরেও তারা ইংরেজিতেই কথা বলে। তখন আমার খুব রাগ লাগে। আমি ইংরেজিতে কথা বলতে চাইলে যুক্তরাজ্যে যেতাম, বাংলাদেশে আসতাম না, তাই না? কেউ বলতে পারে তারা ইংরেজি চর্চা করতে চায়। তাও আমি মানতে রাজি নই। আমার মতো কষ্ট করে তারা বাইরে যাক।
শুধু তাই নয়। দু’শ বছর শাসনের পরেও ইংরেজি নিয়ে পাগল তারা? আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। ফেব্রুয়ারি মাস যখন আসে, সবার মধ্যে ভালোবাসা জেগে ওঠে বাংলা ভাষার প্রতি। তখন বাংলা বইয়ের মেলা হয়, সবাই বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলে, সেই ১৯৫২ সাল নিয়ে টিভিতে বিভিন্ন কথা হয় এবং নানান রকম অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। ২১এ ফেব্রুয়ারিতে শহিদ মিনারে সবাই ফুল দিতে যায়। আবার ১লা মার্চ আসে, সবকিছু ভুলে যায়। ১৯৫২ সালে যারা এই সুন্দর ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন, তখন তাদের কথা আর কারোর মনে পড়ে না। এসব কথা বলেছি। একবার মনে হয়েছে, একটু বেশি কথা বলে ফেলেছি হয়তো। তারপর মনে করেছি- যাক, আমি কাউকে খুশি করানোর জন্য কথা বলার মতো লোক নই। কারোর যদি খারাপ লাগে, লাগুক! কেউ না কেউ সত্যি কথা বলার উচিত।

অবশেষে, একুশে ফেব্রুয়ারি এলো। যেভাবে ভেবেছিলাম, সেভাবে হয়নি। আবার একদম খারাপও নয়। খালি পায়ে শহীদ মিনারে গিয়েছি। কিছু ফুল দিয়েছি। আমাকে বলা হয়েছিলো, এই দিনে হাজার হাজার লোক শহীদ মিনারে আসেন। আমি তাই ভেবেছিলাম, অনুষ্ঠান হবে। গান বাজনা হবে সেখানে। কিন্তু কই? পরে ভাবলাম যে এই দিন আসলে দুঃখের দিন, গান বাজনা হওয়ার কথা নয়। হাজার হাজার লোক এসেছেন ঠিকই। সবাই চুপচাপ ফুল দিয়ে গেছেন বাহান্নর ভাষা সৈনিকদের স্মৃতির মিনারে। হল থেকে আমরা জনাদশেক মেয়ে গেছি সেখানে। আগের বছরগুলোয় নাকি অন্তত ১০ গুণ বেশি উপস্তিতি থাকতো এই প্রভাতফেরিতে। হয়তো, রাজনৈতিক অস্তিরতার কারণে এবার এই অবস্থা। গান বেজেছে লাউডস্পীকারে। সাথে আবৃত্তিও।
২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে শহীদ মিনার লোকে লোকারণ্য। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যরা গিয়েছেন সেখানে। ভোরে হল থেকে যাবো আমরা। খুবই আবেগআপ্লুত, সাথে আন্দোলিতও। এই প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে যাবো। নিজে নয়। যে ভাষা শিখতে এসেছি, সেটির অধিকার রক্ষায় যারা প্রাণ দিয়েছিলেন অর্ধশতাব্দিরও বেশি আগে, তাদের সম্মান জানাতে। পৃথিবীতে আমার জানামতে এমন ঘটনাতো আর একটিও নেই। কেমন হবে শ্রদ্ধা জানানোর রীতি?

ফেব্রুয়ারি এলে বাংলাদেশের মানুষ বেশ পাল্টে যায়। সবকিছুতেই বাংলা ভাষা ব্যবহারের একটা তোড়জোর যেন। সবাই কঠিন বাঙালি হয়ে ওঠে। পোশাকে, কথাবলায়। আমার কাছে কেমন অদ্ভূদ লাগে। সারাবছর অনেকেই দেখি একটু ইংরেজিতে কথা বলতে পারলেই চোখেমুখে সেকি তৃপ্তি! এগারো মাসের সেই চিরচেনা রূপটা ফেব্রুয়ারিতে একদম পাল্টে যায়। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকায়প্রাণ দিয়েছিলেন অনেকেই। এই জাতীয়তাবোধ থেকে বলা হয় পরে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ

স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে, একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কল্যাণে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৯৯ সালে, ইউনেস্কো দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘশণা করেছে। সারাবিশ্বে পালিত হয়। বাংলাদেশেও এই দিনকে ঘিরে বিশেষ আয়োজন। আমার মনে হয়েছে, সারাবছর এই দিনের তেনা ও তাৎপর্য নিয়ে তাদের আর তেমন কোনো উৎসাহ থাকে না। দুঃখজনক!
আমার মতে এই পুরো মাসে সেই ‘ছেলে হারা শত মা’-দের খুব অপমান করা হয়। বোঝাতে চাই যে শুধু এই ফেব্রুয়ারি মাস এলে সবার বাংলার উৎসাহ চলে আসে। সবাই যদি সব সময় বাংলায় কথা বলতো আমার মনে হয় সেই ‘রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি’ বেশি সম্মান পেত। কেউ বলতে পারে যে, ইংরেজি এই যুগের ভাষা এবং পুরো দুনিয়া ইংরেজি ভাষা দিয়েই চলে। কোথায়? ইতালিতে তো চলে না! ফ্রান্সেও না! ইংরেজি সবার জানা থাকলে অবশ্যই খুবে ভালো। তবে তাই বলে কি নিজের ভাষা (এবং সেই ভাষা যদি বাংলা ভাষা হয়) বাদ দিয়ে অন্য একটা ভাষায় কথা বলতে হবে সারা বছর? ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ অনেকে ভুলতে বসেছে আসলে! আবার, দুঃখজনক!