‘দাগ’ যাচ্ছে ফ্রান্সের কানে

নির্মাতা জসিম আহমেদ

বাংলাদেশের নির্মাতা জসীম আহমেদের চলচ্চিত্র ‘দাগ’ ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭০ তম আসরের স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগে (শর্ট ফিল্ম কর্নার) নির্বাচিত হয়েছে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে ছবিটি নির্মিত। আগামী ১৭ থেকে ২২ মে অনুষ্ঠিতব্য উৎসবে এটি প্রদর্শিত হচ্ছে।
এছাড়া ছবিটি কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগেও জমা দেয়া হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় ছবিটি মনোনীত হল কি না তা জানা যাবে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে। শর্ট ফিল্মের যে কোন বিভাগে বাংলাদেশের কোন ছবির অংশগ্রহণ এবারই প্রথম। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, গতকাল পর্যন্ত সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৫৫ টি চলচ্চিত্র গৃহীত হয়েছে। যদিও পুরো ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলচ্চিত্র জমা দেয়ার সুযোগ রয়েছে।
চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় ‘দাগ’ মনোনীত হবে কি না এই প্রশ্নে নির্মাতা জসীম আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে শর্ট, ফিল্ম কর্নারের নির্বাচনকেও তিনি বড় করে দেখছেন। বলেছেন, কানের সাইটে নির্বাচিত সকল ছবির পোস্টার, কলা কুশলীদের নাম সহ বিস্তারিত তথ্য দেয়া আছে। সেখানে প্রযোজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, ও ছবির ভাষা বাংলা উল্লেখ থাকাতেই তার আনন্দ। কারণ, তিনি কানের আগামী আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছেন।
সিনেমাটির নাম দাগ কেন? এ প্রশ্নের জবাবে নির্মাতা জানান, ইংরেজি শব্দ স্ক্রেচ (Scratch) এর সহজ বাংলা দাগ হলেও এর পেছনে প্রতিশোধের বিষয় আছে। একজন নির্যাতিত নারীর মনের দাগ থেকে প্রতিশোধের আগুনই হচ্ছে দাগের গল্প।
এটি নির্মাতার প্রথম চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি টেলিভিশনের জন্য অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র ও কয়েকটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের বেশিরভাগই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের কারাজীবন নিয়ে নির্মিত “বন্দীশালায় নয় মাস” ৯০ দশকে বিটিভিতে প্রচার এবং ব্যাপক আলোচিত হয়। তার সর্বশেষ নাটক প্রত্যাবর্তন যা ২০০১ সালে একুশে টেলিভিশন প্রচার করে।
দীর্ঘ বিরতির পর নির্মিত তার এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন শতাব্দি ওয়াদুদ, শারমিন জোহা, শশী, বাকার বকুল ও অনেকে।
­১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি যখন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রামে ব্যস্ত, পুরনো ঢাকার একটি বাড়িতে বাবার সাথে বসবাস করছিল শিলা। এক রাতে বাসায় আসে তার হবু স্বামী মুক্তিযোদ্ধা জাফর। জানায়, ঢাকায় গেরিলা আক্রমণ হবে। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার মত জাফরও এসেছে আক্রমণে অংশ নিতে। মনে প্রাণে মুক্তিযুদ্ধকে নিজেরই যুদ্ধ গণ্য করা শিলার বাড়িতে দুদিন অবস্থান করে জাফর চলে যায় তার গন্তব্য গেরিলা যুদ্ধে। পরদিন রাতে প্রচ- গোলাগুলির শব্দে শিলার ঘুম ভাঙ্গে। তার দরজায় কড়া নাড়ে পাকিস্তাানি বাহিনীর দোসর কয়েকজন মুখ বাধা রাজাকার। তারা জাফরের অবস্থান জানতে চেয়ে শিলার বাবাকে খুন করে। শিলাকে চাপ দেয় জাফর সম্পর্কে তথ্য দিতে। শিলার কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে রাজাকারদের দলনেতা শিলাকে ধর্ষণ করে। যাওয়ার সময় শিলা ধর্ষক খায়েরকে চিনতে পারে। দেশ স্বাধীনের পর পর অন্যান্য রাজাকারের মত খায়েরও পালিয়ে যায়। ১৯৭৫ এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্যান্য সকল রাজাকারের মত খায়েরও পুনর্বাসিত হয়। ৭১ এ সেই ধর্ষণের দাগ ও ক্ষত রয়ে যায় শিলার মনে এবং সে খুঁজতে থাকে বদর বাহিনীর কমান্ডার খায়েরকে। ১৯৭৯ সালে খায়েরের খোঁজ পেয়ে পরিকল্পনা করে খায়েরকে বিয়ে করে আত্মীয়স্বজনের অমতে। অসংখ্য নারীকে ধর্ষণকারী খায়ের অন্যান্যদের মত শিলাকেও ভুলে যায়। বাসর রাতে খায়ের নববধূ স্ত্রী শিলাকে একইভাবে বিছানায় নেয়, যেভাবে সে অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করেছিলো ১৯৭১ এ যুদ্ধকালিন সময়ে। একাধিক বিয়ে করা খায়েরের নিজের স্ত্রী’র সাথে ধর্ষণের কায়দায় করা সঙ্গম প্রমাণ করে একবার যে ধর্ষক সব সময়ই সে ধর্ষক। শিলা ফুলশয্যার রাতেই সুযোগ বুঝে প্রতিশোধ নেয় নিজের সব কিছু বিসর্জন দিয়ে। তার কাছে এটিও মুক্তিযুদ্ধের অংশ, যে যুদ্ধ শেষ হয়নি।
দাগ এর কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনাঃ জসীম আহমেদ, চিত্রনাট্য ও সংলাপঃ পান্থ শাহরিয়ার, চিত্র্গ্রহণঃ জোগেন্দ্র পা-া, সম্পাদনাঃ সুমিত ঘোষ, সঙ্গীতঃ পার্থ বড়ুয়া, সাউন্ড ডিজাইনঃ রিপণ নাথ, কস্টিউম ডিজাইন, লুবনা সাজিয়া আফ্রিন, আর্ট ইফতেখার খান। নির্বাহী প্রযোজকঃ অম্লান বিশ^াস, প্রযোজনাঃ ভিউজ এন্ড ভিশনস। বিজ্ঞপ্তি।