“সন্দ্বীপের সব মতের, সব দলের, সব পেশার, সব বয়সের মানুষ ব্যক্তি হীনস্বার্থ ও ইগো দ্বন্দ ভুলে প্রতিবাদে জেগে উঠুক”

প্রকৌশলী শামসুল আরেফিন শাকিল একজন অনলাইন এক্টিভিস্ট হিসেবে সন্দ্বীপের সচেতন মানুষের কাছে সুপরিচিত। সন্দ্বীপের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে অনলাইনে আন্দোলন, প্রতিবাদ ও আলোচনায় তিনি বেশ সক্রিয়। ‘জাহাইজ্জার চর সন্দ্বীপের’- অতিসম্প্রতি এমন দাবি তুলে তিনি এর পক্ষে বিশাল জনমত গড়ে তুলেছেন। এ বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন ‘সন্দ্বীপ’ এর সাথে।

প্রশ্ন: জাহাইজ্জার চর নিয়ে আন্দোলন করার বিষয়টা মাথায় এলো কেনো?

উত্তর: আমাদের সন্দ্বীপের সীমানায় মেঘনা নদীতে ১৫ বছর আগে জেগে উঠা ‘জাহাইজ্জার চর’ সন্দ্বীপের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ অবশ্যই তা প্রমাণ করবে।
কিন্তু দুঃখজনক সত্য হল,আমাদের উর্বর এ ভূখন্ড আজ আমার ভাষায় লুট বা দখল হয়ে গেছে আমাদের সবার প্রায় অগোচরে! ইতিমধ্যে প্রায় সবাই জেনেছেন, আমাদের সীমানায় জেগে উঠা এ চরকে আমাদের উপজেলা থেকে বাদ দিয়ে নোয়াখালী জেলার নিঝুম দ্বীপ ও হাতিয়ার অংশ হিসাবে ‘স্বর্ণদ্বীপ’ নামে নতুন মানচিত্রে অন্তর্ভূক্ত করে সন্দ্বীপের হাজার বছরের ভূমির স্বীকৃতি এবং ভূমিহীন নদী সিকস্তি সন্দ্বীপীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
এ চরকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পরিবর্তে কুমিল্লা সেনানিবাসের অধীনস্ত করা হয়েছে। গত ০৭ জানুয়ারি, ওই চরে সেনাবাহিনীর ম্যানুভার অনুশীলন-২০১৬ মহড়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি মিনি ক্যান্টনম্যান্ট উদ্বোধন করেন। এর পরেই, বিষয়টি সবার নজরে আসে! কিন্তু, সপ্তাহখানেক ধওে এ নিয়ে কেউ তেমন কিছু বলেন নি। ১৪ জানুয়ারি, ‘জেগে উঠ দিলাল রাজার উত্তরসূরীরা’ শিরোনামে প্রথম প্রতিবাদী লেখা আমার ব্যাক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রচার করি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে, সন্দ্বীপভিত্তিক প্রায় প্রতিটি গ্রহণযোগ্য নিউজ আইডি, সংগঠনের আইডি ও পেইজ লেখাটি প্রকাশ করলে এটি ভাইরাল হয়ে যায়। এবং ধীরে ধীরে অসন্তোষ ও প্রতিবাদ দানা বেঁধে ওঠে।
বিষয়টিকে আন্দোলন না বলে আমি প্রতিবাদ হিসাবে দেখতে চাই। আন্দোলন হয় পক্ষে-বিপক্ষে। আমাদের বিপক্ষে রাষ্ট্র, সরকার বা দেশপ্রেমিক সেনা বাহিনীকে যারা দাঁড় করাতে চাচ্ছেন তারা মূলত জেগে থেকে ঘুমাচ্ছেন এবং নদী ভাংগা মানুষ এবং সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষের মাটির প্রতি মায়া বা দরদকে এক প্রকার তাচ্ছিল্যই করছেন বলে আমি মনে করি।
সন্দ্বীপের বৃহত্তম এবং যৌক্তিক যে কোন স্বার্থে দল মত নির্বিশেষ আমরা সদা সোচ্চার থেকে সাধ্যমত প্রতিবাদ করে যাই।
মগধরা ছোয়াখালী ঘাটের মোহনার প্রাকৃতিক বালু উত্তোলনের ঘটনায় প্রতিবাদ করেছি আমরা। বিদ্যুতের খুটি লাগানোর অযুহাতে সন্দ্বীপের প্রধান সড়ক দেলোয়ার খাঁ রোডের দুই পাশের গাছ কাটা নিয়েও প্রতিবাদ করেছি আমরা। কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে অনিয়ম, যাত্রী হয়রানী এবং স্পীড বোটের ভাড়া কমানো নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি। স্কুল ছাত্রী নাদিয়া হত্যাকান্ড, কোরবানীর পশুর হাটে ডাবল মার্ডার এর খুনিদের বিচারের দাবীতে আমরা এখনো প্রতিবাে সোচ্চার।
জাহাইজ্জার চর হুট করে মাথায় আসা কোন প্রতিবাদ ইস্যু নয়। এটা আমাদের প্রতিবাদী চেতনার ধারাবাহিকতা।

প্রশ্ন: সরকারী নথিপত্রে চরের মালিকানা মীমাংসিত। এখন এই মুহূর্তে আন্দোলন বা এ বিষয়কে সামনে এনে মালিকানা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কতটুকু?

উত্তর: সরকারী নথিপত্রে চরের মালিকানা মীমাংসিত এটা এখন একপ্রকার বাস্তবতা। তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু, কথা হচ্ছে কোন প্রক্রিয়ায় এ চরের মালিকানা মীমাংসিত হয়েছে সেটা জানার অধিকার আমাদের আছে। সে বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই।
সেনাবাহিনী এখন এ চরের মালিক। নতুন মালিকানা আমরা এখন আর দাবী করছি না। লাঙল কোদাল নিয়ে জমি চাষ করতে জমি বুঝে নিতে কেউ প্রতিবাদ করছে তা আমার জানা নেই।
আমরা চাই স্বীকৃতি। সেনাবাহিনীর বিশেষ ট্রেনিং সেন্টার এবং মিনি ক্যান্টনমেন্ট জায়গাটির অবস্থান নোয়াখালীর স্বর্ণদ্বীপ এর স্থলে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ লেখা হোক। প্রচার হোক। এতটুকু স্বীকৃতির দাবী কি খুব অযৌক্তিক ও অন্যায়?

প্রশ্ন: জাহাইজ্জার চর ইস্যু প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবার পর সামনে আনা হলো কেনো? বলাবলি হচ্ছে, সরকার এবং স্থানীয়ভাবে সরকারী দলের নেতাদের বিব্রত করার জন্য এটা করা হয়েছে। আপনি কি ভাবেন?

উত্তর: প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবার পর চরের মালিকানা বিষয়টি সামনে এসেছে। সন্দ্বীপের মানুষ আগে এ চরকে নিজেদের বলে জানতো। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী যাবার পর তাদের সে ভুল ভেঙ্গেছে। আমরা বিষয়টাকে সামনে এনেছি চরের মালিকানা ইস্যুতে। কাউকে বিব্রত করার জন্য নয়। আমাদের দাবিতে কেউ বিব্রত হবেন, এটা যারা বলেন তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। আমাদের প্রতিবাদকে থামাতে চান তারা। দুঃখজনক সত্য, আমাদের বড় নেতারা বিষয়টিতে মুখে কুলুপ লাগিয়ে শুনশান নীরবতা পালন করছেন, যা নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ বরং বিব্রতবোধ করছি।
আশাকরি, আমাদের নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে শিগগিরই তাদের বক্তব্য সন্দ্বীপবাসীর সামনে তুলে ধরবেন।

প্রশ্ন: এ চর নিয়ে প্রতিবাদ সন্দ্বীপের সাথে আরো আরো এলাকার সীমানা জটিলতায় একটা সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে কি?

উত্তর: প্রতিবাদের চলমান ধারাকে ঐক্যের মাধ্যমে সঠিক নেতৃত্বে আরো বেগবান করা গেলে আমাদের সব সীমানা জটিলতা সমাধানের জন্যে একটা প্রেসারগ্রুপ তৈরি হবে। আর এর মাধ্যমেই আরো অনেক ইস্যুর সন্তোষজনক সমাধান সম্ভব। ঠ্যাংগার চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্যে সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ চরও আমাদের।

প্রশ্ন: এ প্রতিবাদকে আপনারা কিভাবে এগিয়ে নিতে চান?

উত্তর: আমরা চাই অনলাইনে অফলাইনে সবাই নিজের ভেতরের প্রতিবাদ ক্ষোভ নির্ভয়ে প্রকাশ করুক। সবাই নিজেদের গঠনমূলক মতামত দিক।
দেশে-বিদেশে সন্দ্বীপ কমিউনিটি সন্দ্বীপের মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আরো আন্তরিক এবং সোচ্চার হোক। প্রতিবাদ করুক।
সন্দ্বীপের সব মতের, সব দলের, সব পেশার, সব বয়সের মানুষ ব্যক্তি হীনস্বার্থ ও ইগো দ্বন্দ ভুলে প্রতিবাদে জেগে উঠুক।