লেখালেখিঃ ২৯শে এপ্রিল, পূর্বাপর

।। নিগার হারুণ পাপপু ।।

সদরঘাটে নেমে মনে হলো বিশাল কোন জনসভার মুখোমুখি হয়েছি। চারপাশে মানুষের গুঞ্জন, চিৎকার, চেঁচামেচি, কান্নার শব্দ। জনাকীর্ণ জাহাজঘাটে একটা শোরই কেবল উচ্চারিত হচ্ছে, জাহাজ কখন ছাড়বে?’ আমি ভিড়ের মাঝে পাতলা শরীরটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে ঠেলেঠুলে এগুচ্ছি। ঠিক যেমন সাপ এঁকেবেঁকে পার হয়। আমি কান্নার ঢেউকে পাশ কাটিয়ে সামনে ছুটে চলেছি। যতই সামনে ছুটি ততই যেন আহাজারি আরো উত্তাল বেগে আমার পিছু ধাওয়া করছে। কিছুদূর গিয়ে একটা জটলা দেখলাম। সেখানে খিস্তিখেওড়ের নমুনায় বুঝতে পারলাম, চরম অসন্তোষে কারো উপর এখনই হামলা নেমে আসবে। হয়েছিলোও তাই।

 

জাহাজ অফিসের পাষাণ কর্তাদের অবশেষে চৈতন্য ফিরলো। তারা ঘোষণা করলো, একটা জাহাজ এক্ষুণি সন্দ্বীপ এর উদ্দেশে যাত্রা করবে। হাতিয়াবাসীদের জন্য তখন কোন সান্তনা ছিল কিনা জানি না। তবে ঘোষণার সাথে সাথে শুরু হলো অন্য এক বিড়ম্বনা। কে কার আগে ছুটবে, কে আর আগে জাহাজে ঠাঁই করে নেবে, এই প্রতিক্রিয়ায় দুর্যোগের মধ্যে আবারো অন্যরকম এক দুর্যোগ নেমে এলো। এদিকে জাহাজ জেটিতে ভিড়ার আগেই যখন জাহাজে ঠাঁই করে নেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হলো, তখন অন্যদের দেখাদেখি আমিও নিয়ম ভাঙায় মেতে উঠলাম। আমরা কূলের সাথে সারি বেঁধে দাঁড়ানো জাহাজগুলোর একটায় উঠে পড়েছিলাম। তারপর এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে উঠে সন্দ্বীপগামী জাহাজে উঠেছিলাম। জেটিতে ভিড়ার অপেক্ষা করার মতো না ছিল ধৈর্য্য, না তাতে আশা পূরণ হতো। কারণ, গমনেচ্ছু লোকের তুলনায় একটা জাহাজ নিতান্তই অপর্যাপ্ত। কল্পনাতীত দ্রুততায় জাহাজ কানায় কানায় এতটাই ভরে উঠলো যে, স্বাভাবিক যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতাকে তা ছাড়িয়ে গেল। তবুও যখন যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছিল, অবশেষে অভদ্র আচরণে তাদের নিবৃত্ত করতে তারা উঠে পড়ে লাগলো। নোঙর তোলার আদেশ দিয়ে তারা বাকী যাত্রীদের মন আরেকবার ভেঙে দিলো। জাহাজ চলছে। ভীড়ের মধ্যে নিজেকে দেখতে পেলাম গণশৌচাগারের সামনে। আর সেখানেই আমার ঠাঁই হলো। মনে হলো জাহাজঘাটে পা রাখা থেকে শুরু করে শৌচাগারের সামনে ঠাঁই নেয়ার পর রমনীর হাতে থাকা কাপড়ের নকশায় সুঁই সুতোর শেষ কাজটা সম্পন্ন হলো! অন্যসময় জাহাজে কত গুঞ্জন, হৈ হল্লা, ফেরিওয়ালার হাঁক, রেডিও, টুইন ওয়ানের সঙ্গীত, তাস পেটানোর আওয়াজ, নানা ঢঙ এর পদধ্বনি কানে আসে; আজকে সেসব কিছুই নেই। কেমন এক ভয়ার্ত নীরবতা চারিদিকে। সবাই কেমন বাকরুদ্ধ। কারো চোখে জল, কারো চোখে শংকা। সবার চোখমুখে প্রিয়জনের জন্য দুশ্চিন্তা। অথচ, ঠিক দু’দিন আগেই সবাই যে যার মতো ব্যস্ত ছিল। নাগরিক জীবনের কোলাহলে মগ্ন ছিল। একটি রাত সবাইকে কেমন বিষন্ন করে তুলেছে, একটি রাত! গত বিকেলে গুরুআশ্রম থেকে শহরে ফিরে হোস্টেলে যখন এসেছি,তখন আকাশ মেঘলা। মাঝেমাঝে টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল।মেঘলা দিন এমনিতেই মনকে বিষন্ন করে। তদুপরি গুরুআশ্রমের মিলনমেলা ছেড়ে আসার মনখারাপ করা অনুভূতি তখনো বিদ্যমান। মনখারাপ করা যুগল অনুভূতি যখন শয্যাশায়ী করে ফেলেছে ঠিক তখনই বন্ধু ইমতিয়াজ কক্ষে ঢুকে আমার পাশে বসলো। গৌরবর্ণের দীর্ঘকায় বন্ধুটি স্বভাবসুলভ আকর্ণবিস্তৃত হাসি হেসে বললো, যাবি? চল, সিনেমা দেখে আসি। আমার জবাবের অপেক্ষা না করে সে সিনেমাটির প্রলুব্ধকরা বিষয়বস্তুর সবিস্তার বর্ণনা শুরু করলো। তারপর হাত ধরে টেনে উঠিয়ে বললো, রেডি হ, আমি এক্ষুণি আসছি। সে চলে গেলে ভাবলাম, খারাপ কি! মন খারাপ করে বসে না থেকে বরং একটু ঘুরে আসি। আমরা টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বের হলাম। সিনেমা দেখে হলে এসে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমঘুম আবহাওয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই নিদ্রাদেবীর কোলে ঢলে পড়লাম। হঠাৎ শোরগোল শুনে যখন লাফিয়ে উঠলাম তখন দেখি বিদ্যুৎবিহীন রুমের মধ্যে কিছুক্ষণ পরপর বিজলী চমকানির আলো এসে পড়ছে। সে আলোয় দেখলাম বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, সে সাথে ঝড়ের দমকা হাওয়ায় গাছগুলোর পাতায় পাতায় প্রলয়নৃত্য চলছে। রুমের জানালা খোলা ছিল। বাতাসের তোড়ে জানালাগুলো দমাদম আছড়ে পড়ছে, আবার খুলে যাচ্ছে। বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টির পানিতে ততক্ষণে টেবিলের বইপত্র সব ভিজে চুপসে গেছে। আমি দৌঁড়ে গিয়ে জানালা বন্ধ করলাম। এ সময় বাতাসের গতিবেগ কিছুটা টের পেলাম। জলে ভেজা বইপুস্তক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলাম। বৃষ্টির ঝাপটায় কাপড়চোপড়ও ভিজে গেছে। এরই মধ্যে কয়েকজন এসে আমাদেরকে রুম ছেড়ে ডাইনিং রুমে যেতে বললো। তারা বললো, ঝড়ের যে গতিবেগ তাতে এখানে থাকা নিরাপদ নয়। ব্রিটিশ আমলের নয়নাভিরাম এই স্থাপত্য এতদিনে নড়বড়ে হয়ে গেছে। রুম থেকে বের হতেই ঝড়ের আসল রূপ দেখতে পেলাম। ইউ শেইপের বেশ বড় হলের মাঝখানটায় স্কয়ারাকৃতির বাগান। বাগানের গাছগুলোর বেহাল দশা। ঘূর্ণায়মান বাতাস,বাতাসে হুংকারধ্বনি। বৃষ্টির ফোটাগুলো তীরের মত বিঁধছে। হলের চারপাশের প্রাচীন গাছগুলো প্রকট শব্দ তুলে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। যেমন সন্তানহারা মা অবিন্যস্ত চুলে বারবার হাতমাথা মাটিতে ঠেকিয়ে বিলাপ ধ্বনি করে। মনে ভয় জেগে উঠলো। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলাম। দ্রুত ডাইনিং রুমে ঢুকলাম। ততক্ষণে হলের সবতলার ছাত্ররা সেখানে এসে জড়ো হয়েছে। অন্যদিন হলে আসন গ্রহণের নিয়ম মানা হয়। সোফা, চেয়ার, বেঞ্চিতে ক্রমধারা নেমে আসে। সেদিন নিয়ম মানার বালাই ছিলো না। কতক্ষণ পর পর কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দে আমরা চমকে উঠি। সেই অনেক পুরনো মোটামোটা কাঁচের জানালাগুলো বাতাসের তোড়ে দমাদম ভেঙে পড়ছে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর কেউ ককটেলের বিষ্ফোরণ ঘটাচ্ছে। বৃষ্টিবাতাসের প্রলয় তান্ডব, কাঁচ ভাঙা শব্দ, গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ; সবমিলিয়ে ভয়ংকর ভীতিপ্রদ এক অবস্থার মধ্যে একটা পর্যায়ে সোফায় চোখ বুজে এলো। আমি যখন চোখ খুললাম তখন আবছা আলোয় চেনা চারপাশকে বড্ড অচিন লাগছিলো। গাছের ভাঙা ডাল, পাতা, কাগজপত্র, আরো নানা জিনিসে চারপাশ ঢেকে আছে। তারপরে শুরু হলো ছেলেদের আম, ডাব কুড়ানোর পালা। চট্টগ্রাম কলেজের চারপাশে অনেক পুরনো গাছ। সেগুলোর কোনটা ভেঙে কলেজঘেষা রাস্তাটা অবরুদ্ধ হয়েছে, কোনটা ভেঙে পড়েছে কোন স্থাপনার উপর। একটা গাছও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে নেই। তারপর আমরা সবাই মিলে রাস্তা থেকে গাছ সরিয়ে যান চলাচলের ব্যবস্থা করে দিলাম। কিছুটা বেলা হলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে ফিরে এলাম। বাড়ির জন্য একটু চিন্তা হলেও তা তখনো দুশ্চিন্তায় রূপ নেয়নি। কারণ, দ্বীপের বাসিন্দা হিসেবে জন্মগতভাবেই আমরা একটু সাহসী এবং এই ঝড়ঝাপটার সাথে অনেকটাই আমরা পরিচিত। তখন পর্যন্ত আমি স্বচক্ষে বন্যা দেখিনি, দূর্ভিক্ষ দেখিনি। যদিও কয়েকবছর আগে উরিরচরের বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনেছি তবুও তেমন করে প্রভাবিত হইনি কখনো। তখন যোগাযোগের অত সুবিধা ছিলো না। সন্দ্বীপে টিএন্ডটির টেলিফোন সুবিধাও সীমিত পরিসরে ছিল। তদুপরি ঐ রাতে সেটাও বোধহয় বিকল হয়েছিলো। কিছুক্ষণ পরে আমাদের সহপাঠি, সন্দ্বীপের ছেলেটা যখন আমাকে এসে বললো সে খবর পেয়েছে সন্দ্বীপে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারেনি, কারণ সবটাই পানির নীচে ডুবে আছে। খবরের সত্যাসত্য বিবেচনা না করেই আমি লাফিয়ে উঠলাম। হৃদক্রিয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। বাড়িতে তো আমার সবাই আছে,তবে কি তারা….? এক অজানা আশংকায় আমি হল ছেড়ে বের হলাম। আগ্রাবাদে নানী ছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে সান্তনা খুঁজলাম। তাঁরা অভয় দিয়ে বললেন, আমাদের এলাকা নিরাপদ আছে। তাঁরা ইতোমধ্যে খবর নিতে সক্ষম হয়েছেন। সেদিন কাটলো, কিন্তু মন মানছে না। যতক্ষণ না নিজের চোখে সব দেখা হচ্ছে ততক্ষণ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। সে তাড়নাতাড়িত হয়ে পরদিন স্টিমারে চেপে বসলাম। জল কাটিয়ে স্টিমার চলছে। যতদূর দেখা যায় যেন বিষন্নতার চাদরে ঢেকে আছে। কর্ণফুলির দু’পাশ ধ্বস্তবিধ্বস্ত। প্রলয় তা-বের নিশানা ছড়িয়ে আছে সবখানে। ঘোলা পানি কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। এরপর বিভীষিকাময় দৃশ্য। কিছুক্ষণ পরপর ঘোলা পানিতে ভেসে আসছে ঘরের চালা, কাঠ, খড়কুটো। কখনো গৃহিনীর শাড়ি, বাচ্চার শখের জামাজুতো, দাদীনানীদের নামাজের সাদা শাড়ি। ভাসমান দ্রব্যাদির উপর হরেক রকম পাখি, পতঙ্গ, সরীসৃপ। গৃহপালিত পশুদের মৃত দেহ। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম না জানি আর কি দেখতে হয়। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে যা দেখতে চাইনি তাই দেখলাম। অসহায় আদম সন্তানের বাঁচার সংগ্রামে হেরে যাওয়া মৃতদেহ!
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার কোমল মন আর দেখার অনুমতি দেয়নি। চোখ বুজে স্বজনদের মুখ কল্পনা করে বিষাদভারাক্রান্ত হয়ে গেলাম। চোখ খুলে দেখি অন্ধকার ছেয়ে গেছে। থেমে থেমে ভেসে আসা চাপাকান্নার আওয়াজ রাতের অন্ধকারকে আরো ভারি করে তুললো। আমরা সন্দ্বীপের কূলে ভিড়েছি বেশ রাতে। কিন্তু ততক্ষণে জানতে পারলাম রাতটা আমাদের জাহাজেই কাটাতে হবে।ভাটার কারণে তীর থেকে দূরে নোঙর করা হয়েছে। তাছাড়া জাহাজ থেকে তীরে ভিড়ানোর নৌকা এই মুহুর্তে কোথাও নেই। সেই প্রথম সাগরজলে বিনিদ্রা রাত কাটানো। কিছুক্ষণ পরে আমার সঙ্গীয় দ্বীপবাসী কিছু শুকনো খাবার এগিয়ে দিলো। যদিও খাওয়ার রুচি নেই তবুও কৃতজ্ঞচিত্তে তা গ্রহণ করলাম। চরম বিপদের ক্ষণেও সজ্জন তার পরোপকারী গুণ হারায় না। গহীন অন্ধকার, ঢেউ এর গর্জন, জাহাজভর্তি আদম সন্তানের স্বজনচিন্তা; সে এক অবর্ণনীয় অচিন্তনীয় ক্ষণ। মানুষের জীবন সত্যিই বিচিত্রস্মৃতির পসরা সাজিয়ে থাকে। সকালের আবছা আলোয় প্রকৃতির তা-ব পরবর্তী ঝিম মেরে থাকা মুখাবয়বের সাক্ষাৎ মিললো। খানিক দূরের দ্বীপচিহৃ যুগপৎ আনন্দিত ও শংকিত করলো। জলের দিকে মুখ ফিরাতেই আবারো জীবন সংগ্রামে হেরে যাওয়া মানব সন্তানের দেহ ভেসে যেতে দেখলাম। আহা জীবন! শোরগোল শুনে বুঝলাম আমাদের উদ্ধারকারী নৌকা এসে গেছে। প্রতিযোগীতামূলক অবতরণের সময় অনভ্যস্ত হাতে দড়ির রশি বেয়ে নামার সময় জাহাজ থেকে ছিটকে পড়ে গেলাম। সহানুভূতিশীল হাতগুলো ছোঁ মেরে নৌকায় তুলে নিলো। কূলে পৌঁছে আবার প্রলয়লীলার চিহ্নের মুখোমুখি হলাম। মনে হলো চারিদিকে এলোকেশী বিবস্ত্র জননীর মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। কাদা মাড়িয়ে কূলে পৌছে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। স্বজনদের উদ্দেশ্যে মন বলে উঠলো, তোমরা ভালো আছো তো? চারপাশের বিধ্বস্ত দশা দেখে দেখে যখন বাড়ি পৌঁছলাম, হৃদয়ে জেগে উঠা কান্নার ঢেউ সম্বরণ করে মা’র বুকে মাথা রেখে নিশ্চিত হলাম,আমরা বেঁচে আছি। আমরা তো বেঁচে গেলাম কিন্তু যারা হারিয়ে গেল, যারা সব হারিয়ে ফেললো, তার জন্য কি সান্তনা রইলো? কিংবা প্রকৃতি’র অনুরাগীরা বিশ্বাস করে এই উভয় শক্তি কখনো অবিচার করেন না এবং তাঁদের খেয়ালিপনাও রহস্যাবৃত। তবে দ্বীপবাসী কোন খেয়ালের শিকার হয়ে বারবার অসহায় হয়ে পড়ে? জানি না।