লেখালেখিঃ বিরহের পারাপার

।। আলাউদ্দিন মাহমুদ সমীর ।।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ঢাকা থেকে সন্দ্বীপে গিয়ে ঈদ করব বলে মাকে কথা দিয়েছিলাম। সেভাবে ঈদের আগের দিন সকালের বাসের টিকেট করলাম। কিন্তু বন্ধের মধ্যেও সেদিন সকালেই অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ এসে পড়ায় সকালের বাসে আর যাওয়া হয়নি। ভাবলাম আর যাওয়া হবে না। এদিকে মাকে কথা দিয়েছি, তাই দুই তিন ঘন্টার মধ্যে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে পুনরায় বাসের টিকেটের চেষ্টা করতে থাকলাম। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে অবশেষে রাতের বাসের একটা টিকেট পাওয়া গেল। এবার যেন কোনভাবেই যাত্রা বিভ্রাট না হয়, তাই বাস ছাড়ার সময়ের অনেক আগেই বাস স্টপেজে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু দুই তিন ঘন্টা ধৈর্য্যরে পরীক্ষা দেওয়ার পর অবশেষে মধ্যরাতের পরে বাস ছাড়ল। ঈদের অবর্ণনীয় জ্যাম অতিক্রম করে সীতাকু- পৌঁছাতেই সকাল নয়টার বেশী। সীতাকু- থেকে একটা রিক্সা নিলাম ফকিরহাট লঞ্চঘাটের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় দেখি কোথাও ঈদের নামাজ হচ্ছে, কোথাও নামাজ শেষ। একজন আরেকজনের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, কেউ মৃত পরিজনের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কবর জিয়ারত করছে। বিশেষ করে দেখলাম একটি ছেলে একটি নতুন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে অঝোরে কাঁদছে। আহা হয়ত তার অতি প্রিয়জন আজ এই খুশীর দিনে তার সাথে নেই, কবরের বাসিন্দা আমার মনটা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। আরও খারাপ লাগছে আমার মা হয়ত এতক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে না জানি কত কি ভাবছেন। আমার জন্ম যদি সমুদ্রের ওপাড়ে সন্দ্বীপে না হতো, তাহলে এতক্ষণে আমি বাড়িতে থাকতাম। কোন যোগাযোগ নেই, তখনও মোবাইল ফোনের প্রচলন হয়নি। ভাবতে ভাবতে এক সময় লঞ্চঘাটে পৌঁছলাম। জনশূন্য বেড়িবাঁধ, উপরে উঠে দেখি আমার মত দুর্ভাগা দুজন লোক মালিকবিহীন খালি চায়ের দোকানে বসে আছে। তাদের কাছে জানা গেল খুব ভোরে একটি লঞ্চ ছেড়ে গেছে, এরপর সন্দ্বীপ যাওয়ার আর কোন লঞ্চ নেই। মনে মনে আমার পূর্বপুরুষের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করলাম, দুনিয়ার এত জায়গা থাকতে কিভাবে, কেন সন্দ্বীপে বসতি স্থাপন করল, এখন আমাদের এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। ভাবতে লাগলাম কি করা যায়। ঢাকায় ফিরে যাব, না চট্টগ্রামে বোনের বাসায় গিয়ে উঠব। যেহেতু ঈদের নামাজ শেষ তাই আর তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই। বরং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তারপর ফিরে যাব। বসে বসে ভাবতে লাগলাম পর্যটনের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে যে কোন দ্বীপ, যেখানে লোক টাকা খরচ করে বেড়াতে যায়। তাহলে আমরা কেন আমাদের জন্মভূমিকে অবজ্ঞা করি? অথচ এটির ভাঙন রোধ করা বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা আজ পর্যন্ত কোন সরকারের দ্বারা হয়নি। বরং সন্দ্বীপকে কল্পনা করতে থাকি মরিশাস, মালদ্বীপের কোন দ্বীপ অথবা আমেরিকার হাওয়ায় দ্বীপ। এমন কোলাহলমুক্ত, পরিবেশ দূষণমুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ আর কোথায় আছে তাইতো কাটগড় কালাপানিয়া থেকে গাছুয়া পর্যন্ত পাঁচ ছয়বার বাসস্থান রাক্ষুসী নদী গ্রাস করার পরও সন্দ্বীপে ঠিকানা ছাড়তে পারিনি। এ যেন সন্তানকে পিতামাতা ত্যাজ্য করার পরও আপন গৃহে বারবার ফিরে আসা। ভাবতে ভাবতে আরও পনের ষোল জন সন্দ্বীপ এর যাত্রী বেড়ি বাঁধে এসে হাজির। দল ভারী হওয়ায় অনেকে ভাবছেন একটা বিকল্প ব্যবস্থা হলে যাওয়া যেত। কিন্তু যাব কিভাবে? পাশের খালে জেলে নৌকায় কর্মরত জেলেদের সাথে কথা বললে তারা বেশী টাকার বিনিময়ে ঐ পাড়ে পৌঁছে দিতে রাজী হলো। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ছোট জেলে নৌকায় যেতে ভয় পেলেও আবহাওয়া ভাল থাকায় শেষ পর্যন্ত সবাই সম্মত হল। আমি দ্বিগুণ উৎসাহে তাদের সাথে রওনা দিলাম। মার সাথে ঈদ করব বলে কথা দিয়েছিলাম, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছে মায়ের দুশ্চিন্তা দূর করা দরকার। নিজেকে এখন বিদ্যাসাগর মনে হতে লাগল। সাগরের মাঝখানে ছোট্ট জেলে নৌকাটিকে একটি ভাসমান পাতার মত মনে হয়। জেলের সহকারী ছোট্ট ছেলেটি একটু পর পর একটি বাটি দিয়ে নৌকার তলায় ছিদ্র দিয়ে ঢুকা পানি সেঁচে দিচ্ছে। ওদের মনে বা চেহারায় কোন ভয়ের চিহ্ন নেই। আমরা মনে মনে দোয়া পড়তে লাগলাম কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করছি না, বরং ভয় তাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। তবুও
“দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার!”
সন্দ্বীপের কূলে পৌঁছে মনে হল কাল সারাদিন, সারারাত এত যুদ্ধ, এত অনিশ্চয়তা, এত ভয় সব যেন এক নিমেষে শেষ। দ্বীপের দখিনা হাওয়া যেন সব ক্লান্তি মুছে নিয়ে গেছে। একটি রিক্সা নিয়ে ঘাটের সন্নিকটে বাড়ির দিকে যাত্রা। চারিদিকে ছেলেমেয়েরা নতুন জামাকাপড় পড়ে এবাড়ি ওবাড়িতে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে ব্যস্ত। সন্দ্বীপে সবাই সবার পরিচিত, সবাই সবার আত্মীয়, সন্দ্বীপের ঈদের আনন্দ আর কোথাও নেই। ধনী গরীব নির্বিশেষে সব ছেলেমেয়েদের এই উচ্ছল, অনাবিল আনন্দের মাঝে আমি আমার অত্যন্ত ছোটবেলার এক মর্মান্তিক দুঃখের ঈদের স্মৃতিতে ফিরে গেছি।
তখন নদী ভাঙতে ভাঙতে আমদের কাটগড়ের বাড়ির পিছনে এসে গেছে। আমার মা আমাকে ও আমার ছোটভাই সুমনকে খুব সকালে গোসল করিয়ে নতুন জামা কাপড় পরিয়ে আমাদের বাড়ির উত্তরে হুদ্রাকালীর বসুল্লার হাটের স্কুলের সামনের ঈদগাহের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। আমার পাশের বাড়ির ছোট বেলার সাথী ছেলেটিও আমাদের সাথে রওয়ানা হল। ছেলেটির নাম ভুলে গেছি, এত বছরে অনেকবার নামটি মনে করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু মনে আসেনি। ওর জন্মের পর ওর মা মারা গেছে। গরীবের ছেলে, পুরনো জামা গায়ে, তবুও সে অতি আনন্দে আমাদের সাথে ঈদগাহে যাচ্ছে। আমরা এতই ছোট যে ঈদগাহে নামাজ পড়তে নয়, বরং আশেপাশে মেলার মত নানারকম দোকান থেকে বাদাম, বুট, মিটাই, মন্ডা কিংবা বেলুন, বাঁশী বা অন্যান্য খেল
না কিনে খেলতে খেলতে বাড়ি ফিরা ছিল আমাদের ঈদের আনন্দ। এজন্য আব্বা আমাদের টাকা পয়সা দিতেন। নাম ভুলে যাওয়া খেলার সাথীটির পকেট শুন্য। আমরা দুভাই ঠিক করলাম, আমরা যা যা কিনব ওকেও তাই কিনে দেব। অর্ধেক পথ যাওয়ার পর বিপরীত দিক থেকে উদোম গায়ে কাদা মাথা অর্ধেক লুঙ্গি কুচা করা একজন লোক হাপাতে হাপাতে আমাদের সাথী ছেলেটিকে বলল, “তোর মায়ের কবর অর্ধেক আজ সকালে নদীতে ভেঙ্গে গেছে, বাকিটিও যে কোন সময় ভেঙে যাবে, আমার সাথে এখনি কবরস্থানে আয়।” আমরা সবাই তার পিছনে পিছনে দ্রুত নদীর পাড়ে কবরস্থানে গেলাম। গিয়ে দেখি কবরস্থানের অর্ধেক নদীগর্ভে, বাকী অর্ধেকে একটি কঙ্কাল এখনো আছে, তবে যে কোন মুহুর্তে নদীতে পড়ে যাবে। কঙ্কালটির মুখম-লের হাড়, কিছু দাঁত এবং লম্বা চুল এখনো দেখা যায়। নাম ভুলে যাওয়া সাথীটি তার মৃত মাকে এই অবস্থায় দেখে হাউ মাউ কেঁদে উঠে। আমরা কঙ্কাল দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ঐ লোকটি আমাদের সাথীটিকে ধরে বাড়িতে নিয়ে গেল। এর কয়েকমাস পর আমাদের বাড়িও নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় প্রতিবেশীরা কে কোথায় চলে গেছে আর খোঁজ পাইনি, নাম ভুলে যাওয়া সাথীটিও এখন কোথায় আছে জানিনা। সীতাকু- থেকে লঞ্চঘাটে যাওয়ার পথের রাস্তায় কবরের পাশে কান্নারত ছেলেটির দুঃখের সাথে সন্দ্বীপে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া মায়ের কবরের পাশের কান্নারত আমাদের সাথীটির দুঃখের তুলনা করি। সীতাকু-ের ছেলেটির আপনজনের তবুওতো একটি চিহ্ন আছে, আর সন্দ্বীপের ছেলেটিরতো তাও নেই। ভাবতে ভাবতে রিক্সা আমাদের বর্তমান বাড়ির দরজায়, তখন প্রায় সন্ধ্যা। মা ঘরের কোণায় আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে রাস্তা দেখা যায়, সবার জন্য ঈদ তখন শেষ আর মায়ের সাথে আমার ঈদ মাত্র শুরু। কিন্তু নাম ভুলে যাওয়া আমার ছোটবেলার সাথীটি কি সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়েও কোনদিন তার মায়ের দেখা পাবে? কোনদিন কিংবা কোন ঈদে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করতে করতে দু’ফোটা চোখের জল ফেরার জন্য কি ফিরে পাবে মায়ের কবরটি?

লেখক সন্দ্বীপের সন্তান।
কাজ করেন ঢাকায় বেক্সিমকো গ্রুপে, মহাব্যবস্থাপক পদে।
তিনি একজন সঙ্গীত শিল্পীও।