সন্দ্বীপের স্বার্থ নিয়ে মামলা করে ভিক্ষুকের মতো দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি: ‘সন্দ্বীপ’কে বায়রন চৌধুরী

­­­

জাহাইজ্জার চর, ঠ্যাংগার চরের মালিকানা ইস্যুতে আবার আলোচনায় সাইফুল হক চৌধুরী ওরফে বায়রন চৌধুরী; যিনি বছরের পর বছর সন্দ্বীপের মানচিত্র নির্ধারণের দাবিতে মামলা আর আবেদন নিবেদন করে চলেছেন। ‘সন্দ্বীপ’ এর সাথে আলাপচারিতায় বলেছেন নানান কথা। নিজের দুঃখবোধের কথা।

সালেহ নোমানঃ সন্দ্বীপের সীমানা নিশ্চিত করতে গিয়ে বর্তমানে ছয়টি মামলার ঘানি টানছি। ভিক্ষুকের মত সবার দ্বারে দ্বারে গিয়েছি কেউ সহায়তা করেনি। দলমত নির্বিশেষে সন্দ্বীপের সব নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বলেছিলাম চরে চলেন, উরির চরে আসেন, জাহ্ইাজ্জার চরে যান, ঠ্যাংগার চরে যান। কেউ কর্ণপাত করেননি। পরিণতিতে, সন্দ্বীপের মানুষের জেগে উঠা ভুমি অন্যরা দখল করে নিয়ে যাচ্ছে। ‘সন্দ্বীপ’ এর সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে কথাগুলো বলেছেন কালাপানিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল হক চৌধুরী বায়রন।
উরির চরের একটি অংশকে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভূক্ত করার প্রতিবাদে হাইকোর্টে তিনটি মামলা করেন সাইফুল হক চৌধুরী ও তার মা উরির চরের সাবেক চেয়ারম্যান তাহমিনা হক চৌধুরী। এর জেরে সাইফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয় নোয়াখালীতে, যা প্রতিহিংসামূলক বলে মনে করেন তিনি।
সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, সন্দ্বীপের পশ্চিম অংশে জেগে উঠা চর ও ভূমিগুলো সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের, যুগযুগ ধরে সমুদ্রের ভাঙ্গনে ভিটেমাঠিসহ সবকিছু হারিয়েছে এখনকার মানুষ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ভূমি যখন আবার জেগে উঠেছে তখন আর কেউ এসব খেয়াল করেনি। এই সুযোগে নোয়াখালীর সুযোগ সন্ধানী চক্র নতুন জেগে উঠা ভূমি দখল নিতে তৎপর হয়ে উঠলে আমার মরহুম বাবা আছাদুল হক চৌধুরী সাহেব মিয়া একাই রুখে দাঁড়ান।
২০০০ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর এটা নিয়ে সন্দ্বীপের কোন নেতাকে ভাবতে দেখিনি। সন্দ্বীপের ভূমি রক্ষার জন্য বাবার শুরু করা সংগ্রাম এসে পড়ে আমার ওপর। ২০০২ সালে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে উরির চরে একটি অংশকে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহি ইউনিয়নের একটি অংশ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এটা আমারা মেনে নিতে পরিনি, উল্লেখ করেন তিনি।
সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, ইতিহাসেই আছে এক সময় সন্দ্বীপ ছিলো একটি পরগণা। পরবর্তীতে নানা প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে এর বিভিন্ন অংশ নোয়াখালীসহ অনান্য জেলার সাথে সংযুক্ত করা হয়। ১৯১৩-১৬ সালে সিএস জরিপে সন্দ্বীপের মানচিত্র ও ভূমির পরিমাণ নির্ধারিত হয়। ১৯৫৪ সালে সন্দ্বীপ নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামের সাথে সংযুক্ত হওয়ার পর তখনো কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। এরপরও সন্দ্বীপ ছিলো ৬০ মৌজার। এর উত্তরে- দক্ষিণে দৈর্ঘ ৩৬ মাইল ও পূর্ব- পশ্চিমে প্রস্ত ছিলো ২৮ মাইল। এই হিসেবে সন্দ্বীপের আয়তন হয় ১০০৮ বর্গমাইল যা ১৬১২.৮বর্গ কিলোমিটার, কিন্তু কোথায় আমাদের সেই সন্দ্বীপ? হারানো ভূমি প্রাকৃতিক নিয়মে আবার জেগে উঠলেও সেদিকে দৃষ্টি ছিলোনা কারো। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। মাঝখানে একা লড়াই করতে গিয়ে সর্বসান্ত হয়েছি, উল্লেখ করেন তিনি।
সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, ছয়টি মামলা চালাতে গিয়ে জায়গা-জমি প্রায় সব বিক্রি করে দিয়েছি। আমার মা, স্ত্রী ও সন্তানদের গয়না বিক্রি করে দিয়েছি। আমার বাবা ও আমার পরিবারের সদস্যদের নামে নানা ধরণের অপবাদ দেওয়া হয়েছে। কাউকে পাশে পাইনি। শুধুমাত্র চরের ভূমিহীন সাধারণ মানুষরা পাশে ছিলো বলে এই লড়াই এখনো চালাচ্ছি, কতদিন তা ধরে রাখতো পারবো জানি না।
সন্দ্বীপের এমন কোন নেতা নাই যে যার কাছে যাইনি। সবাইকে বলেছি এটা নিয়ে সোচ্চার হোন। ভিক্ষুকের মত সবার দ্বারে দ্বারে গেছি। আমি সন্দ্বীপের অবস্থাসম্পন্ন বিশিষ্ট পরিবারেরর সন্তান হওয়া সত্বেও অনেকে আমাকে যা তা বলেছে, আমার নানা ৩০ বছর ও বাবা ৩০বছর চেয়ারম্যন ছিলেন, মা চেয়ারম্যান ছিলেন, আমিও চেয়ারম্যান। তারপরও সন্দ্বীপের স্বার্থে সব অপমান সহ্য করছি।
বায়রন চৌধুরী বলেন, বিএনপি আমলে কামাল মিয়ার কাছে গেছি। তিনি বলেছেন, মওদুদ সাহেবের বিরুদ্ধে যাওয়ার মত অবস্থা আমার নেই। বর্তমান এমপি মিতা সাহেবের কাছে গেছি। তিনি বলেছেন, কাদের সাহেবের বিরুদ্ধে আমি যেতে পারবো না। প্রতিটি মামলায় হাইকোর্টে মওদুদ সাহেব খুব তৎপর থাকেন। রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও কোম্পানীগঞ্জে মওদুদ আহমদ ও ওবায়দুল কাদের এলাকার স্বার্থে এক হয়ে যান। আমাদের মামলাগুলোতে নোয়াখালীর ২৭ জন পক্ষভুক্ত হয়েছে, অথচ সন্দ্বীপের হয়ে আমি একই লড়াই করছি।
তিনি বলেন, আদালতের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। উরির চরের সীমানা বিরোধ নিয়ে গত বছর মার্চ মাসে ভূমি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ছিলেন। আমাকে ডাকা হয়েছিলো। সেখানে সব খুলে বলেছি। আবেগ চেপে রাখতে পারিনি অঝোরে কেঁদেছি। মন্ত্রীরা আমাকে সান্তনা দিয়েছেন। সেখানে থাকা ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জমান জাবেদ স্তম্ভিত হয়ে বলেছিলেন, তাহলে কি আপনার সম্পর্কে আমাদেরকে ভূল তথ্য দেয়া হয়েছিলো? সেই বৈঠকে ১৯১৩- ১৬ সালের সিএস এবং ১৯৫৪ সালের সংশোধিত ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের জন্য সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু, এক বছরেও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালীর ডিসিকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছেনা কেন। তারা বলেন, এই নিয়ে উপরের চাপ আছে। কি চাপ? কার চাপ এসব আর বলে না।
২০১২সালে একবার সীমানা নির্ধারণ করার জন্য উদোগ নেয়া হয়েছিলো, তারা ভূয়া ম্যাপ নিয়ে এসেছে, আসল ম্যাপ গায়েব করে রেখেছ। আমার কাছে আসল ম্যাপ আছে। আমার বাবা রেখে গিয়েছিলেন। সেটা কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক শামসুল আরেফীন সাহেবকে দেখিযেছি। তিনি ছবি তুলে নিয়ে গেছেন। এই ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হলে আর কোন সমস্যা থাকেনা- বললেন বায়রন চৌধুরী।
তিনি বলেন, আমাদের জায়গায় জেগে ওঠা চরে নোয়াখালীর বিভিন্ন নেতার নামে হাজার হাজার একর জমি আছে। সন্দ্বীপের কোন নেতার ২/৪ একর জায়গাও নেই। কোম্পানীগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান বাদল সাহেবের কয়েকশ একর জায়গা আছে উরির চরে। সে একদিন আমাদের এমপি’র অফিসে আমাকে আদবের বাইরে কথা বলেছে। তাকে বলেছি, আপনি চরে কাজ করতে আসতেন বেশি দিন হয়নি, কোথা থেকে কি হয়েছেন আমরা সব জানি। আমি জমিদার পরিবারের সন্তান। চরে আমার তিল পরিমাণ জায়গাও নাই। হিসাব করে কথা বলবেন।
তিনি আরো বলেন, উরিরচর নিয়ে অনেক দূর্নীতি হচ্ছে। ২০/৩০ হাজার টাকা করে নথি বিক্রি হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রহিমের নামে সম্প্রতি করা বেশ কিছু দাগ নাম্বার পাওয়া গেছে, এবছর খায়রুƒল আলম ভায়ের ছেলেরা ১৮/২০ লাখ টাকা আয় করেছে। তার আগের বছর ফুলমিয়া চেয়ারম্যান ৩০ লাখ টাকা আয় করেছে। তারা খাল ইজারা নিয়ে এসব টাকা কামিয়েছে। কিন্তু চরের জন্য কোন কিছু করেনি। চরের জমি নিয়ে কি পরিমাণ দূর্নীতি হচ্ছে তা দুর্নীতি দমন কমিশনে জানিয়েছি,সব কিছুর হিসাব হবে।
আমার বক্তব্য হচ্ছে, সন্দ্বীপের ম্যাপ সন্দ্বীপেরই থাকুক। সেটা নির্ধারণ করে দেয়া হোক। এবার সেখানে সরকার কিংবা রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী যা করার করবে। আমাদের কোন আপত্তি নেই। জাহাইজ্জার চরে ক্যান্টনমেন্ট হয়েছে আমরা খুশী। কিন্তু, সেটাকে নোয়াখালীর উল্লেখ করতে হবে কেন? এই চর থেকে হাতিয়ার দূরত্ব ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার অথচ সন্দ্বীপের দূরত্ব মাত্র চার পাঁচ কিলোমিটার। এই চর নোয়াখালীর হয় কিভাবে?