চিন্তা, দল, এমনকি প্রার্থনায়ও ব্রুকলিনে বিভক্ত সন্দ্বীপ

বিশেষ প্রতিনিধি: কি নেই? জনবল, অর্থ, ঐতিহ্য, সম্ভাবনা, সামাজিক মর্যাদা আর ইতিহাস? যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনে সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের বয়সওতো খুব কম নয়। এমনও না যে, তারা তৃতীয় সারির কোন জনগোষ্ঠী, যারা কিনা নিজ দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের হাত ধরে বা পদাঙ্ক অনুসরণ করে পাড়ি দিয়েছিলো স্বপ্নের আমেরিকায়। সন্দ্বীপের মানুষের আমেরিকা আবিষ্কার ক্ষেত্রবিশেষে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের চেয়ে আগে। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে চার্চ এভিনিউ আর ম্যাকডোলাল্ড এভিনিউর সঙ্গমস্থলে ’লিটল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার কারিগরতো সন্দ্বীপেরই লোকজন। এই এলাকাকে কেন্দ্রীভূত করে আশপাশে সন্দ্বীপের মানুষের বসবাস গড়ে উঠেছে কয়েক দশক আগে। আর তাদের দেখাদেখি এখানে এসেছে বাংলাদেশের আরো আরো এলাকার মানুষ। চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডে ব্যবসা বাণিজ্যের গোড়াপত্তনওতো সন্দ্বীপীদের হাতে। তাহলে?
এখন ব্রুকলিনে সন্দ্বীপের মানুষ বিভক্তির বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছেন। চিন্তায়, দলে, সাধনায়, প্রার্থনায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, কলায়, বাণিজ্যে-সবকিছুতেই তাদের বিভক্তি। বহুধারা। দলে বিভক্তি আছে। মসজিদ নিয়ে বিভক্ত আছে। সং স্কৃতি চর্চা নিয়ে বিভক্তি চরমে। ছোট্ট একটা দ্বীপ উপজেলা থেকে বিদেশ বিভূূঁইয়ে এসে বিভক্তির জালে নিজেকে সঁপে দেননা খুব কম মানুষই আছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে সন্দ্বীপের কতো লোক আছেন? কারো হিসেবে ৩০ হাজার, কারো হিসেব আরো কমের। এদের বেশিরভাগ থাকেন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে। তাও আবার চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকায়। স্বাভাবিক কারণে, সন্দ্বীপীদের সবকিছু এই এলাকা কেন্দ্রিক। প্রার্থনা, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, আনন্দ-উল্লাস; সবকিছুই। আর বিভক্তির রেখাটাও এখানে স্পষ্ট দেখা যায়।
সন্দ্বীপের মানুষের কল্যাণের জন্য সমিতি কয়টা লাগে? একটা কি যথেষ্ট নয়? আছে দুইটা। সেখানেও রাজনীতি।
সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন পুরনো সংগঠন। সেটা ভেঙ্গে হয়েছে সন্দ্বীপ সোসাইটি। প্রথমটি আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজনের নিয়ন্ত্রণে। সোসাইটি নিয়ন্ত্রণ করে বিএনপিন্থীরা, তাতে আওয়ামী লীগ ছাড়াও অন্য দলের নেতা-সমর্থকরা আছেন।

এতো গেলো উপজেলাভিত্তিক সংগঠনের কথা। প্রায় সবক’টা ইউনিয়নের সমিতি আছে। আবার সেই সমিতিগুলোর নেতাদের মধ্যে আছে বিভক্তি। একটি সমিতিতেও গণতান্ত্রিক নিয়মনীতির বালাই নেই। উপদেষ্টা পরিষদ বা কমিটি বা প্যানেল সব কিছুর নিয়ন্তা। তারাই ঠিক করে দেয় নেতৃত্ব। যাদের নিয়ে সংগঠন, সেই সদস্যদের কোন অবদানই নেই নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায়।
‘এইতের লগে আইট্টেন না।’
‘কি? ঝামেলা আছে নি?’
’না। এন্নে কইলাম।’
ব্রুকলিনে প্রথম পা রেখে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি, এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোণা। ’এন্নে কইলাম’ একটা বার্তা প্রকাশের ধরণ হলেও এর মধ্য দিয়ে বিভক্তির বার্তাটাই দেয়া হয় আগন্তুককে।
সমিতি, সংগঠনের বাইরেও ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বিরোধ চরমে। একই টেবিলে পাশাপাশি বসেন রেস্তোরাঁয়, কথা নেই, কুশল বা শুভেচ্ছা বিনিময় নেই। বলা যায়, সন্দ্বীপীদের মধ্যে সত্যি বিরোধের মহামরি চলছে।
‘সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন, নর্থ আমেরিকা’ যুক্তরাষ্ট্রে সন্দ্বীপবাসীর প্রথম সংগঠন। ব্রুকলিনভিত্তিক। বিভক্তির শিকার হয়ে এটি এখন ক্ষয়িষ্ণু। এ সংগঠন থেকে বের হয়ে ’সন্দ্বীপ সোসাইটি ইউএসএ’ নাম দিয়ে আরেকটি সংগঠন করেছেন ভিন্নমতাবলম্বী নেতারা। সেখানেও বিভক্তি। এবং খুব প্রকট।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে আছে দু’টি সংগঠন। একটি আওয়ামী লীগ ঘরানার আর অন্যটি এন্টি আওয়ামী লীগ। ইউনিয়ন পর্যায়ে বাউরিয়ার দু’টি সংগঠন। একটির অস্তিত্ব এখন কাগজ-কলমে। অন্যটির নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ আছে। আর কোন ইউনিয়নে দু’টি সংগঠনের অস্তিত্বের কথা জানা যায়নি।
সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে বিরোধ আর নেতাদের মধ্যে এতো বিভক্তি কেনো? এ বিষয়ে কথা বলেছি অনেকের সাথে। বিভেদ-বিভক্তির কারণ বলেন ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগই তাদের নাম প্রকাশ করতে চান না। এদের সবার কথায় একটা বিষয় স্পষ্ট যে, সংগঠনের নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তারা সন্তুষ্ট নন। নির্বাচন ছাড়াই, সংগঠনের সদস্যদের পছন্দ ছাড়াই নির্বাচিত হন নেতা। গণতান্ত্রিক কোন রীতিনীতির বালাই নেই এতে।
সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি, ব্যক্তি পর্যায়ে বিরোধও প্রকট। একই চিন্তার মানুষগুলোর মধ্যে বিভক্তি। বিভক্তি একই দল বা আদর্শের মানুষের মধ্যে। কেনো? ’নেতৃত্বের লোভ আর ইর্ষা’- বলেছেন অনেকেই।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্দ্বীপীদের নিয়ন্ত্রণে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের তিন সহ সভাপতির বাড়ি সন্দ্বীপে। এছাড়া, এখানে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে সন্দ্বীপের আরো অন্তত ৫ জন নেতা রয়েছেন। ব্রুকলিন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটিও সন্দ্বীপের দখলে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র (এখন কমিটি বিলুপ্ত) শীর্ষপর্যায়ের পদে ছিলেন সন্দ্বীপীরা। নিউ ইয়র্ক সিটি বিএনপি’র সভাপতি এবং সহ সভাপতিসহ কয়েকটি পদে আছেন সন্দ্বীপীরা। এদের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ কি পর্যায়ে তা সবার জানা। বিরোধ বিভেদ কখনো কখনো রক্তক্ষয়ে গড়িয়েছে।
বিভেদ প্রার্থনা নিয়েও। মসজিদের কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ ঠেকেছে বিভক্তিতে। তৈরি হয়েছে একাধিক মসজিদ। এখানেও আওয়ামী লীগ এবং এন্টি আওয়ামী লীগ। এন্টি আওয়ামী লীগ ঘরানায় প্রাধান্য বিএনপি-জামাত। স্বার্থের কারণে জোটবদ্ধ বিএনপি-জামাতেও যে বিভক্তি আছে সেটি ব্রুকলিনে মসজিদ সংস্কৃতিতে স্পষ্ট। এক চিন্তার মানুষ অন্যচিন্তার নিয়ন্ত্রণাধীন মসজিদে নামাজ আদায়ের ঘটনা বিরল।
’এরা সৃষ্ট্রির চেয়ে ধংসে বিশ^াসী বেশি। আর এই বিরোধ বিভক্তি শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ে। কিংবা যিনি একটু বিত্তবান। সাধারণ সন্দ্বীপীদের মধ্যে এসব অনুশীলন কম।’- বললেন ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি সংগঠনের এক নেতা। তার মতে, সাধারণ সন্দ্বীপীদের কেউ চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এসে যখন সংগঠন করতে শুরু করেন, বিভেদের বিষ তখনি তার মাথায় ঢোকে। অর্থবিত্ত হলে অনেকের শখ জাগে নেতৃত্ব দেয়ার। আর তখন নিজের দলভারি করতে তিনি বিভেদের রাজনীতি শুরু করেন।
একসময় সন্দ্বীপীরাই চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকার গোড়াপত্তন করেছিলেন। এখানে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। এখন এই চৌমোহনায় সন্দ্বীপীরা ক্ষয়িষ্ণু সম্প্রদায়। এর কারণ কি? এমন অনেক প্রশ্নের যে উত্তর, তাতে মন ভালো হবার কোন কারণ নেই। সন্দ্বীপের মধ্যে কেনো এতো বিভেদ, কেনো এতো বিরোধ, কেনো তারা একতাবদ্ধ নয়?
এটা কি শুধু ইর্ষা, নেতৃত্বের লোভ? সন্দ্বীপীরা নিজেদের প্রশ্ন করুনতো!