নিউ ইয়র্ক থেকে আরো একটি বাংলা পত্রিকা!

মোস্তফা কামালঃ নিউইয়র্কে পত্রিকার প্রচন্ড ভিড়। সেই ভিড়ের হাটে নতুন কালেকশন ‘সন্দ্বীপ’। সচরাচর আমরা বলে থাকি, পাঠকদের না ঠকালে নতুন পত্রিকা অবশ্যই ক্লিক করবে। কিন্তু, খোরাক মতো পত্রিকার কাটতি নির্ধারণের এখতিয়ার শুধুই পাঠককুলের। আর মূল দায়িত্বটা ভারবাহী সোহেল মাহমুদদের। এটাও পত্রিকার বাস্তবতা। পত্রিকা থেকে সেবা প্রার্থীর অভাব হয় না। কিভাবে, কি করলে ভালো হবে, কাটতি বাড়বে- এ বিষয়ক শলাপরামর্শেরও কমতি হয় না। কিন্তু সুহৃদ-শুভার্থী মেলা ভার। পত্রিকাকে এগিয়ে নেয়ার জ্বালানিও পাওয়া কঠিন। এরপরও, ‘সোহেল মামা’ শুরু করেছেন। তা-ও বিদেশভূমে, মার্কিন মুল্লুকে। এ আয়োজনে তিনি টপ প্রায়োরিটি দেবেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী সন্দ্বীপবাসীদের। তাদের সাফল্য, আনন্দ-বেদনাকে তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি সন্দ্বীপ গড়ার সাধ তার। বিশ্বজুড়ে চালান দেবেন তাদের খবরাখবর। জানাবেন বিশ^বাসীর খবরও। লেখা আহবান করে একেবারে জন্মভাষায় লিখেছেন: ‘আম্নে সন্দ্বীপ্পা অইলে সন্দ্বীপ লই ল্যাখেন সন্দ্বীপে। মন খুলি, যিয়ান ইচ্চা হিয়ান।’ আবার বলেছেন, অন্যদেরও বঞ্চিত করবেন না। এরই মধ্যে, তিনি তথা দিয়েছেন: ‘সন্দ্বীপ হবে সবার। কোনো এক পক্ষের না। না টিটুর, না মিতার। না শাহজাহানের, না কামালের।’ বোঝাইতো যায়, উল্লেখ করা নামগুলোর বাছাইও তাৎপর্যে ঠাঁসা। যদ্দুর শুনেছি, সোহেল মাহমুদের আয়োজনে কমতি নেই। মেধার সাথে পরিশ্রমতো তার সৌন্দর্য্যরেই অংশ। রুচি-পছন্দে বরাবরই ব্যতিক্রম। কিছু একটা শুরু করলে শেষ দেখার চেষ্টা করেন। সেই অভিজ্ঞতায় আমার ধারণা প্রবাসেও মাত করার একটা স্বপ্নবাজিতে ব্যস্ত তিনি।
সন্দ্বীপ ভবনে পরিচয়লগ্ন থেকেই সোহেল মাহমুদ আমার মামু। আমিও তার মামু। কেউ কারো ভাগিনা নই। এটিএন বাংলা ছাড়া আর কোথাও আমরা একসাথে চাকর খাটিনি। কিন্তু খাওয়া-পরা, আড্ডা, হাটা-চলা একসাথে নিয়মিত। ভাষা এবং বিষয়-আশয়ও প্রায় অভিন্ন। কখনো কখনো অখন্ড। আমাদের পেশার কেউ কেউও আমাদেরকে একই এলাকার এবং আত্মীয়-স্বজন মনে করেন। মামা-মামু ডাকে একাত্মার কারণে আমাদের টান জন্মে গেছে অলক্ষে-অজান্তেই। প্রবাসে চম্পট দেয়ার পর বারুদ মাখানো অগ্নিস্মৃতির মতো টানটা যেন আরো বেড়ে গেছে।
সন্দ্বীপ একটা জায়গা বা ভূগোলের নাম। কিন্তু ঢাকায় আমাদের সংবাদ কর্মীদের কাছে সন্দ্বীপ একটি পত্রিকার নাম। নতুন স্টাইলের পত্রিকা। সন্দ্বীপ ভবনটি নতুন হলেও দেওয়ালের ইটগুলো সব সময়ই মনে হতো পুরনো। আমি তখন সাড়া জাগানো সাপ্তাহিক সুগন্ধায়। পত্রিকা দু’টির অফিস কাছাকাছি। মতিঝিল শরীফ ম্যানশনে সুগন্ধা। এর উপকণ্ঠ টয়েনবি সার্কুলার রোডে আশির দশকের উপান্তে সন্দ্বীপ ভবন। দু’টি পত্রিকাতেই কাজ করেন, লেখেন দেশসেরা লেখক-সাংবাদিকরা। কবি সালেম সুলেরি ভাই সম্পাদক হওয়ার পর সন্দ্বীপে আমার যাতায়াতটা বেড়ে যায়। মেধা-যোগ্যতায় তার ধারে কাছে ঘেঁষার সামর্থ না থাকলেও অকারণেই তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। মাঝেমধ্যে লেখা ছাপতেন। সুগন্ধায় চাকরির আড়ালে স্বনামে-ছদ্মনামে। নঈম নিজাম, সাইফুল আলম, পারভেজ আলম চৌধুরী, ফজলুল বারী, ইয়াসির ইয়ামিন, শহীদুল আজম, সুমন মাহমুদ, সাইফ ইসলাম দিলাল, রাশেদ আহমেদ, ফরিদ বাশার, ফেরদৌস সালাম, দীপক সাহাসহ অনেকের সাথে চেনাজানা ওই সন্দ্বীপ ভবনেই। পরে এক পর্যায়ে পরিচয় সোহেল মাহমুদের সাথে। কিছুটা পরে হলেও এই পরিচয়টার আমেজ ছিল একটু ভিন্ন। মামু দিয়ে শুরু। এখনো মামুতেই। সন্দ্বীপ হাউস থেকে পরে প্রকাশ হয়েছিল স্বদেশ খবর, ব্যাংকার, চোখে চোখে, দৈনিক রূপালি এবং আরো কয়েকটি পত্রিকা। এসবের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন ভীষণ রসিক, সাংবাদিকবান্ধব। তার বিশেষ স্নেহ প্রাপ্তিতে ছিল সোহেল মাহমুদের সম্পৃক্ততা। মুস্তাফিজ ভাই আমার সাংবাদিকতা জীবনে দেখা অন্যতম ব্যক্তিত্ব। একেবারে জন্মভাষায় কথা বলে স্বস্তি পেতেন। আমরা একটু-আধটু ব্যঙ্গ করলে খুশি হতেন। বেশ মুগ্ধ হতেন ‘দ্বীপবন্ধু’ উপাধিতে। পরবর্তীতে সন্দ্বীপ থেকে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। বিসিআই নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধারও ছিলেন। সেগুলো আরেক ইতিহাস। খ- খ- করে লিখলে ফর্মায় কুলাবে না। লেখক- সাংবাদিকদের বাইরে রাজনীতিক, শিল্পি, খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদের বেশ যাতায়াত ছিল সন্দ্বীপ ভবনে। আশপাশেও বসতো সাংবাদিকদের জটলা। সামিল হতেন দৈনিকবাংলা, বিচিত্রা, অবজারভার, চিত্রালি, বাংলার বাণী, সিনেমাসহ বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদকর্মীরা। ওই মিলনমেলা থেকে সোহেল মাহমুদ মাঝেমধ্যে হুট করে হারিয়ে যেতেন। ক্যারামবোর্ডের আসর বা মুস্তাফিজ ভাইয়ের রুম থেকে ধরে এনে ক’টা টাকা জরিমানা আদায়ের সেই স্মৃতিগুলো বড় নস্টালজিক। সেই নস্টালজিকতা কাটিয়ে আবার আসছে সন্দ্বীপ ভাবতেই যেন কেমন ভালো লাগছে।
সন্দ্বীপ সবার পত্রিকা হোক। অসংখ্য পত্রিকার ভিড়ে তৈরি করুক নতুন দৃষ্টান্ত। এই কামনা।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন। অধুনালুপ্ত বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক সুগন্ধার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, গেদুচাচার খোলাচিঠির লেখক