‘আমাদের একতা নাই। আমরা ঈর্ষাপরায়ণ, পরশ্রীকাতর’ বললেন, মাহফুজুল মাওলা নান্নু, সভাপতি, সন্দ্বীপ সোসাইটি ইউএসএ

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সন্দ্বীপবাসীর বিভিন্ন জনের সাথে নানা বিষয়ে আলাপ করে তা সাক্ষাতকার আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে “সন্দ্বীপ”। শুরুতেই থাকছে বিভক্ত সন্দ্বীপীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন “সন্দ্বীপ সোসাইটি ইউএসএ”র প্রথম নির্বাচিত সভাপতি আলহাজ্ব মাহফুজুল মাওলা নান্নুর সাক্ষাতকার।


সন্দ্বীপের মাইটভাংগা ইউনিয়নের বাসিন্দা নান্নু নিউ ইয়র্ক সিটি বিএনপি’র সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তার সাথে কথা বলেছেন “সন্দ্বীপ” সম্পাদক সোহেল মাহমুদ।
নিউ ইয়র্কে সন্দ্বীপের যারা থাকেন, তাদের বেশিরভাগই রাজনীতি, সমাজ, সংগঠন- সবকিছু নিয়ে বিভক্ত। দিন যতো যায়, এ বিভক্তি আর কমে না। কেন?
“সন্দ্বীপ” এর কাছে এ নিয়ে মন খুলে কথা বলেছেন, ব্রুকলিনভিত্তিক সংগঠন “সন্দ্বীপ সোসাইটি ইউএসএ”র সভাপতি আলহাজ্ব মাহফুজুল মাওলা নান্নু। ব্রুকলিনে নিজের সংগঠনের জন্য বাড়ি কিনে তিনি তখন তুমুল আলোচনায়। জনাব নান্নুর এ সাক্ষাতকার নেয়া হয় এ বাড়ি কেনার পরদিনই।
প্রশ্ন: আপনারা বলছেন, প্রবাসী সন্দ্বীপীদের জন্য একটা ঠিকানা করতে পেরেছেন। কিন্তু, এ বাড়ি কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক অবিশ্বাস আর সমালোচনা ছিল। এর কারণ কি?
উত্তর: সব কাজ, সেটা ভালো হোক আর খারাপ, সমালোচনা কিন্তু হবেই। এটা বন্ধ করা যাবে না। আপনাকে দেখতে হবে সত্য কোনটা, বাস্তবতা কি। এই মুহূর্তে সত্য আর বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা বাড়ি কিনেছি। যুক্তরাষ্ট্রের বুকে সন্দ্বীপবাসীর একটা ঠিকানা করতে পেরেছি। এখন অবিশ্বাসী আর সমালোচনাকারীদের আবার তাদের আগের কাজটা, মানে অবিশ্বাস আর সমালোচনা করতে বলুন। তারা সেটা করবেন না। পারবেনও না। মানুষ খাবে না।
প্রশ্ন: বুঝলাম। তাহলে, যারা এসব বলেছিল, তারা আপনার বিরোধী পক্ষ? প্রতিপক্ষ? আপনি তাদের বক্তব্যকে অপপ্রচার বলবেন?
উত্তর: আমি তাদের নিয়ে আর কোন কথা বলবো না। আমি আমার কাজ করেছি। প্রতিশ্রুতি রেখেছি। আমাদের কমিটির নির্বাচনী ওয়াদা ছিল বাড়ি কেনা। সেটা আমরা করেছি। তাই, আমি আর পক্ষ বিপক্ষ খুঁজতে চাই না। আমি মনে করি, প্রচার অপপ্রচার যাই হোক, সেটা আমাদের সারাক্ষণ সতর্ক রেখেছে। আমরা খুব তটস্থ ছিলাম যেন নিজেদের কোন ভুল না হয়। পাছে কেউ কিছু বলার সুযোগ পেয়ে যায়। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর, তিনি আমাদের নিয়ত পরিষ্কার রেখেছিলেন।
প্রশ্ন: বাড়ি তো হল। এখন কি নিজেদের মধ্যে বিভক্তি দুর করার উদ্যোগ নেবেন?
উত্তর: কি বলেন! আমরা নেতৃত্বের লোভ ছাড়বো কিভাবে? যার যোগ্যতা নেই, সেও নেতা হতে চায়। আপনি ভালো কিছু করতে চাইবেন, আপনার সমালোচনা শুরু করবে একটা পক্ষ। একবারে অর্থহীন সমালোচনা। অথচ, তাকে ওই কাজ করতে দেন, পারবে না। সন্দ্বীপ ভবনের কথা ধরুন। আমি আর আমার সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান পান্না মিলে আমাদের কমিটির সদস্যদের পরামর্শে যখন বাড়িটি কিনতে গেলাম, সংগঠনের তহবিলে টাকা নেই। নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে বাড়ি কিনেছি। এরপর, দুই বছর মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেছি। এই সময়ের মধ্যে আমাদের নিয়ে সমালোচনার ভাষা শুনলে অবাক হবেন আপনি। দুই বছর অনেক কিছু মোকাবেলা করেছি।
প্রশ্ন: প্রবাসী সন্দ্বীপীদের এই সংস্কৃতি পাল্টানো যায় কিভাবে?
উত্তর: কিভাবে আশা করেন? কখনোই পাল্টাবে না। সবাই নেতা হতে চাইলে যা হয় আর কি! আমাদের কমিউনিটিতে আন্তরিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সহমর্মিতা, সর্বোপরি একতা নাই। আমরা ঈর্ষাপরায়ণ। পরশ্রীকাতর।
প্রশ্ন: নেতৃত্বের প্রতি লোভ কি আপনার নেই? আপনি কি সোসাইটির সর্বশেষ নির্বাচনকে প্রভাবিত করেনি নি? ইলেকশনের বদলে সিলেকশনে কৌশলে বাধ্য করেছেন নির্বাচন কমিশনকে- এমন অভিযোগও তো আছে আপনার বিরুদ্ধে!
উত্তর: এ দাবি সঠিক নয়। আমি কোন কিছুতে প্রভাব বিস্তার করিনি। আমাদের কমিটি নির্বাচনের দিন তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের মাধ্যমে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছে। বাকি সব কাজে আমাদের বা আমার কোন ক্ষমতা ছিল না। সোসাইটির ৩১ জন উপদেষ্টা আছেন। তারা যেভাবে ভালো মনে করেছেন, করেছেন। সংগঠনের গঠনতন্ত্র তাদের সে ক্ষমতা দিয়েছে।
প্রশ্ন: সংবিধান কিংবা গঠনতন্ত্রের কথা যতোই বলুন, সোসাইটির কোন কোন সদস্য এই প্রক্রিয়ায় সন্তুষ্ট নন। তাদের কেউ কেউ বলছেন, ভোট হলেও আপনারা আবারো জয়ী হতেন। কিন্তু, নির্বাচন ছাড়া যে প্রক্রিয়ায় হয়েছেন, তা তাদের ভালো লাগেনি। উপদেষ্টারা কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন?
উত্তর: ভোট হলেও হারজিতে কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হতেন। সমস্যা হচ্ছে সবাই কিছু না কিছু বলতে চায়। উপদেষ্টারা কেন এভাবে করলেন বলা মুশকিল। আমার মনে হয়, তারা “সন্দ্বীপ ভবন”কে মাথায় রেখেছিলেন। সে সময়, বাড়ি সোসাইটির নামে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি হয়নি। আবার নির্বাচিত হবার পর, আমরা আমাদের সদস্যদের দুয়ারে দুয়ারে গেছি। টাকা তুলেছি। এরপর, বাড়িটি কিনেছি। এটি এখন সমিতির সম্পদ। যখন আমরা বাড়ি কিনি, দাম যা ছিল, ২ বছরে সেটা বেড়ে গেছে প্রায় ৩ গুণ। এখন এ বাড়ি থেকে মাসে মাসে ৬ হাজার ডলার ভাড়া আসবে। মাসে মাসে কিস্তি দেয়ার ঝামেলা নাই। আমরা দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়াতে এই বাড়ি সন্দ্বীপ সোসাইটির জন্য কেনা চূড়ান্ত করতে পেরেছি। উপদেষ্টারা হয়তো সোসাইটির ভালো চেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নির্বাচন না করার।
প্রশ্ন: আপনি বিভেদ নিয়ে কথা বললেন। ছোট একটা উপজেলা সন্দ্বীপ। অথচ, এখানকার বাসিন্দা প্রবাসীরা বিভক্ত বহু দলে আর মতে। এই ব্রুকলিনেই গোটা যুক্তরাষ্ট্রের নামে আপনারা সন্দ্বীপীদের দুইটা সংগঠন চালান। ইউনিয়নগুলোর সংগঠনের কোন কোনটাই চরম বিভক্তি। কোন্দল। একজন শীর্ষ কমিউনিটি নেতা হিসেবে নিজেদের বিভেদেও এ দায় কি আপনাকেও নিতে হয় না?
উত্তর: অবশ্যই, দায় আমাকেও নিতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভেদ কমানোর চেষ্টা যে হয়নি কখনো, তা নয়। শুরুতে আমরা সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন, নর্থ আমেরিকা নামে যাত্রা করেছিলাম। এরপর, নেতৃত্বের বিরোধ শুরু। তহবিল তছরুফের ঘটনা থেকে এসোসিয়েশনে ভাঙ্গন ধরে। একটা পক্ষ বেরিয়ে এসে নতুন সংগঠন সন্দ্বীপ সোসাইটি ইউএসএ গড়ে তোলে। আমি বলবো, নেতৃত্বে জবাবদিহিতা আর স্বচ্ছতার অভাব ছিল বলে এই পরিস্থিতি। এখন, একজন মানুষ যদি সত্যি ভেতর থেকে না পাল্টান, তাকে শত চেষ্টা করেও পাল্টানো যাবে না। এ ব্যর্থতায় আমার দায় আছে। কিন্তু, ত্রুটি আছে বলা যাবে না। সব ধরণের চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি কিভাবে আমাদের কমিউনিটিকে আরও একতাবদ্ধ করা যায়। আপনি বলুন না, এটা কি সম্ভব?
প্রশ্ন: এ বিষয়ে মূল্যায়ন করার মতো অভিজ্ঞতা ব্রুকলিনে আমার এখনো হয় নি। ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আপনাদের সোসাইটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
উত্তর: একটা বাংলা স্কুল করতে চাই আমরা। এখন এ বিষয়ে পরিকল্পনা করছি। এরপর, আরবি শিক্ষার জন্য এক স্কুল করবো। সন্দ্বীপবাসীর জন্য ইতোমধ্যে ১২০টি কবরের জায়গা কেনা হয়েছে নিউ জার্সিতে। আমরা এখন সোসাইটির খরচে সন্দ্বীপীদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে থাকি।
প্রশ্ন: সোসাইটিতে দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতির দায়িত্বে আপনি। কি চিন্তা তৃতীয়বার নিয়ে?
উত্তর: সময় বলবে। সময়ে বলবো।
সোহেল মাহমুদ: নান্নু ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ, ”সন্দ্বীপ” পাঠকদের জন্য বেশ সময় দিয়েছেন বলে।
মাহফুজুল মাওলা নান্নু: আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার পত্রিকার মাধ্যমে সন্দ্বীপের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমার সালাম, শুভেচ্ছা আর ভালবাসা।