১২ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ!

চট্টগ্রাম অফিস: উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সন্দ্বীপে উত্তর ও পূর্বাংশের প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার বাঁধ পূণ:নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের কারণে বেড়িবাঁধে বসবাস করা প্রায় ১২হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নীতির আওতায় না পড়ায় এসব লোকজনকে পূন:বাসনের কোন উদ্যোগ নেয়া হবেনা। তবে, ভবিষ্যতে বাঁধে বসবাসের জন্য পূর্বের বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম সার্কেলের নির্বাহি প্রকৌশলী জুলফিকার তারেক জানিয়েছেন, ৪০কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপি চূড়ান্ত হয়েছে, প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে। ৩৬কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ হবে ২০১৯সালের মধ্যে।

তিনি জানান প্রকল্পের আওতায় সন্দ্বীপের কালাপানিয়া থেকে শুরু করে মগধরা পর্যন্ত এলাকার বেড়িঁবাধ সমুদ্র স্তর থেকে  কমপক্ষে ২৪ ফুট উচূ করা হবে। বাধেঁর উপর অংশ ১৪ফুট প্রশস্ত এবং নীচের অংশ ৩৬ ফুট প্রশস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন উচ্চতার বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যাতে জোয়ারের পানি বাঁধ ডিঙ্গিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে।

তিনি আরো জানান, সম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক স্থানে বর্তমান বাঁধ ডিঙ্গিয়ে এক থেকে দুই ফুট জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। সেই কারণে নতুন বাঁধটি আগের চেয়ে কমপক্ষে ছয় ফুট উচূ করা হচ্ছে। ষাটের দশকে নির্মাণ করা পূর্বের বেড়ি বাঁধটি  সমুদ্র স্তর থেকে ১৮ফুট উঁচুতে ছিলো।

এদিকে, সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্দ্বীপের উত্তর-পূর্বাংশের নতুন বেড়ী বাধঁ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বেড়ীবাধেঁ বসবাস করা হাজার হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

বাউরিয়া এলাকার বেড়ী বাধেঁর বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমগীর(৪০) জানিয়েছেন, গত  তিশ বছরের বেশি সময় ধরে বেড়িবাঁধে বসবাস করছি, এখানে ঘরের আশপাশে নানা ধরনের শাক সবজি, গাছ গাছালির আবাদ ও গবাদি পশু লালন- পালন করে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন ধারন করছিলাম, কোন ধরনের পরিকল্পনা কিংবা পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমাদেরকে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন কোথায় আশ্রয় মিলবে আমাদের?

একই এলাকার বাসিন্দা আয়শা খাতুন(৫৫) বলেছেন, পশ্চিমের নদী ভাঙ্গনে ভিটে মাটি হারিয়ে পূর্বের বেড়ীবাধেঁ এসে আশ্রয় নিয়েছিলাম, এখন সেই আশ্রয়ও চলে গেলো। পরিবার পরিজন নিয়ে যাওয়ার কোন জায়গা থাকলোনা।

বাউরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এই ইউনিয়ন সংলগ্ন বেড়ি বাঁধে ৩২০ পরিবার বসবাস করতো,  কাজ শুরু হওয়ায় এসব পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়া না হলেও অনেকে নিজ থেকে ঘরবাড়ী নিয়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যাচ্ছে। বেড়িবাধেঁ বসবাসকারিদের অনেকে একেবারেই নি:স্ব। তারা এখানে বৈধ না অবৈধভাবে বসবাস করছে সেই বিতর্কে না গিয়ে তাদের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে জরুরী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা যেতো।

এত বিপুল সংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক অস্থিরতার আশংকা দেখা দিবে বলেও মনে করেন চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন। এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডর দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহি প্রকৌশলী জুলফিকার তারেক এই প্রসঙ্গে বলেছেন, বেড়িবাঁধে বসবাসকারিরা আইনত অবৈধভাবে বসবাস করছিলো। এতদিন তাদের উপর কোন হস্তক্ষেপ করা হয়নি, উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ায় তাদের আর সেখানে থাকার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে সেখানে বসবাস করার সুযোগ তৈরী হলে পুরানো বাসিন্দাদেরকেই অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

৪০কিলোমিটার বেড়ী বাঁধ পূন: নির্মাণ প্রকল্প ছাড়াও সন্দ্বীপের দক্ষিণ- পশ্চিমাংশে ২’শ কোটি টাকা ব্যয়ে বোল্ডার বাধঁ নির্মাণ কাজ চলছে। এই প্রকল্পের আওতায় পশ্চিমাংশের ভাঙনকবলিত দশ কিলোমিটার বোল্ডার বাধঁ নির্মাণও শেষ হবে ২০১৯সালের মধ্যে।

Recommended For You