স্মরণ: সন্দ্বীপের কিংবদন্তিতূল্য ব্যবসায়ী মৌলভী আজিজ

অধ্যাপক জাহাঙ্গীর শাহানেওয়াজ ডিকেন্স: মুল ভুখন্ড থেকে বিছিন্ন দ্বীপ হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহি স্বর্ণদ্বীপ সন্দ্বীপের আলহাজ্ব মৌ: আজিজুর রহমান একটি নাম, একটি সংগ্রাম, একটি ইতিহাস এবং সর্বোপরিএকটি বিকশিত আত্মার প্রতিফলন। তিনি একজন অসাধারণ আলোকিত ব্যক্তিত্ব। ৫০ এর দশকের প্রথম দিকে সর্বসাকুল্যে দুইশ টাকা দিয়ে সন্দ্বীপ টাউনের পোলঘাট এলাকায় তাঁর গ্রোসারী ব্যবসা শুরু করেন। মাত্র ৫ বৎসরের মধ্যে তিনি তাঁর শ্রম, মেধা, সততা, নিষ্ঠা এবং নিরলশ কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে সন্দ্বীপের একজন চৌকষ ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠীত করেন। তিনি খুচরা এবং পায়কারী বিক্রয়ের মাধমে সন্দ্বীপের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা গ্রাম, ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের  মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেরনার উৎস এবং চির আরাধ্য প্রেমিকের স্থান  দখল করেন। মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের সৈয়দ বেপারীর জেষ্ঠ সন্তান মৌ: আজিজুর রহমান সন্দ্বীপ  টাউনে হরিশপুর ইউনিয়নে ডাক বাংলোর পাশে নয়নাভিরাম প্রথম নির্মিত অট্রালিকায় বসবাস শুরু করেন ৫০ এর দশকের গোড়ার দিকে। তিনি অতি অল্প সময়ে তাঁর বিরতিহীন পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্দ্বীপ টাউনে ত্রিশটি দোকানের মালিক এবং শিবেরহাটে প্রায় ২০ টি ষ্টোরের স্বত্ত্বাধিকারী হন। “ পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসুতি” এই বাণি চিরন্তনী তাঁর জীবনের অবিনাশী দর্শন।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে দদকহড়ষিবফমব রং ঢ়ড়বিৎ”. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশী শিক্ষিত না হলেও তাঁর বিদ্যাতে কমতি ্আছে বলে ঠাহর হয় না। তাইতো তিনি জ্ঞানের মশাল জ্বালানোর যারপর নাই  চেষ্টা করেছেন অবহেলিত দ্বীপের ঘরে ঘরে। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় “ আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারেরও যাত্রী।”

তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ক্রিড়া সংগঠক। সন্দ্বীপ মোহামেডাম স্পোটিং ক্লাবের  পৃষ্ঠপোষক ছাড়া ও তিনি ছিলেন ক্রীড়ামোদি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সামাজিক সংগঠনের অন্যতম  সাহায্য দাতা। বিভিন্ন  টুর্নামেন্টে অংশ গ্রহণকারীদের তিনি নিয়মিত প্রেরনা ও উৎসাহ প্রদান করতেন।

মৌ: আজিজুর রহমান ছিলেন আপাদমস্তক একজন সংস্কৃতিসেবী। সুকুমার বৃত্তি চর্চার জন্য সন্দ্বীপে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায়  তিনি বিশেষ অনুদান দিয়ে থাকতেন। তিনি পৌর জনগনের তথা সন্দ্বীপ বাসীর হৃদয়ে একজন খাঁটি সংস্কৃতিসেবী হিসেবে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন। দদঘড় হধঃরড়হ পধহ  ফবাবষড়ঢ় রিঃযড়ঁঃ পঁষঃঁৎধষ ধপযরবাবসবহঃ” এই কথাটি তাঁর জীবনে প্রতিফলিত হয়েছিল।

তিনি ছিলেন সন্দ্বীপ পৌর এলাকার উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি। একজন জননন্দিত ব্যবসায়ী ছাড়াও তিনি ছিলেন হরিশপুর টাউন তথা সোনার দ্বীপের উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি কেবল মাত্র দ্বীপ মাতৃকার গর্ব নন একজন আধুনিক রূপকারও বটে। “ আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা, আলো নয়ন ধোয়া আমার আলো হৃদয় হরা।”নিভৃতচারী এই মানুষটি সর্বপ্রথম নিজস্ব অর্থায়নে সন্দ্বীপ টাউনে বিজলি বাতির সরবরাহ নিশ্চিত করেন। আমার মনে আছে কাঠের খাম্বা দিয়ে তিনি ইলেক্ট্রিক লাইন চালু করেন। তিনি প্রথম ব্যবসায়ী যিনি সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের নিমিত্তে সন্দ্বীপে শিল্প, কারখানা স্থাপন করেন। তাঁর স্থাপত্যগুলোর মধ্যে ছিল গেঞ্জির মিল, লবনের ইনডাষ্ট্রি এবং ধান ও গম ভাঙ্গানোর কারখানা। ষাটের দশকে তিনিই সর্বপ্রথম সন্দ্বীপে পারিবারিক পরিবহনের জন্য প্রাইভেট কার (মটর গাড়ী) আমদানি করেন। উক্ত গাড়ীটির ধংসাবশেষ দেখার জন্য শত শত মানুষ ভিড় জমাতো সন্দ্বীপ টাউনের বাস ভবনের সামনে অবস্থিত গারাজে।

নৌ-পরিবহনের সঙ্গে ছিল তার পারিবারিক এবং আতিœক যোগাযোগ। তিনি প্রায় ৩০ টি কার্গো নৌকার স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনিই সম্ভবত, সন্দ্বীপে প্রথম ইঞ্জিনচালিত ট্রলার চালু করেন।

তিনি ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ ব্যক্তিত্ব। তার মত নিভৃতচারী, নির্লোভ ও নিরহংকার ব্যক্তি দেশ এবং প্রবাসের লক্ষ লক্ষ সন্দ্বীপবাসীদের গর্ব। তিনি নিরবে নিশব্দে কর্মের মাঝে ডুবে থাকতে পছন্দ করতেন। তাঁর জীবন দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় রবি ঠাকুরের শেষের কবিতার ক’টি লাইন “মোর লাগি করিও না শোক, আমার রয়েছে কর্ম,আমার রয়েছে বিশ্বলোক ”

গরীব, দু:খী নিন্মবিত্তদের ঋণ দানের নিমিত্তে তিনি সন্দ্বীপ কোঅপারেটিভ ব্যাংকের উদ্যেক্তার ভুমিকায় অবর্তীন হন। তিনি উক্ত ব্যাংকের পরিচালনা র্পষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।

তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল একটি অমর কাব্যের মত।

“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে

আসে নি কেহ অবনী পরে

সকলের তরে সকলে আমরা

প্রত্যেকে আমরা পরের তরে”।

তাঁর সমগ্র জীবনের অন্যতম অর্জন  ছিল সন্দ্বীপ চেম্বারস এন্ড কমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন। ক্ষণজম্মা সন্দ্বীপের এই প্রাণপুরুষ উত্তাল সমুদের সংঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে একদিন ঐ সাগরেই চিরনিদ্রায় হারিয়ে গেলো।

আমার রক্তের বাঁধন নানাভাইয়ের লাশ পাওয়ার জন্য জলে স্থলে শত শত মানুষ তন্ন তন্ন করে খুজেঁ বেড়ায়। বাংলাদেশ সরকার হেলিকপ্টার দিয়েও লাশের সন্ধান অব্যাহত রাখে। কিন্তু তিনি আর আমাদের মাঝে ফিরে আসলেন না। আমরা তাঁর সাগরবিধৌত পবিত্র লাশখানি খুজেঁ পাই নাই।

তখন আমার কানে বাজছিল কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের অমর কাব্যখানি।

“ নয়ন সমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাঁই

আজি তাই শ্যামলে শ্যামল, তুমি নীলিমায় নীল।

আমার লিখিল তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।

নাহি জানি, কেহ নাহি  জানে তব সুর বাজে মোর গানে

কবির অন্তরে তুমি কবি, নও ছবি নও ছবি তুমি কি কেবলি ছবি।

আর কবি নজরুলের ভাষায় শেষ করছি আজকের এই স্মারক প্রতিবেদন।

“কাল হতে আর ফুটবে না হায় লতার বুকে মঞ্জরী,

উঠবে পাতায় পাতায় তাহার করুন নি:শ্বাস মর্মরী।

লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশান,

নর্থ আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং

টি এন্ড টি কলেজ, মতিঝিল ঢাকার ইংরেজী বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান।

Recommended For You