সৌদি আরবের ডায়েরি

সাইফুল ইসলাম, মক্কা থেকে: আমি ২০০৪ সাল থেকে সৌদি আরবে আছি। তখন থেকে দেখছি এখানকার বাংলাদেশীর প্রবাস জীবন কেমন। আমরা এখানে যারা আসি বেশিরভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত /নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। আমরা ও আমাদের পরিবার অনেক বেশি (অনেকের ক্ষেত্র আকাশকুসুম) স্বপ্ন নিয়ে আমাদের কে পাঠায়, কিন্তু তারা জানেনা, বা জানতে চায়য় না এখানকার পরিস্থিতি কেমন। এখানে আসার পর প্রথম আমাদের পায়ে অদৃশ্য শিকল পরিয়ে দেয়া হয়। কফিল (স্পন্সর) নামের এক শিকল। তার ইচ্ছেই সবকিছু, এমনকি তার ইচ্ছের বাইরে শ্বাস নেয়া দায়।

২০০৬ সাল পযর্ন্ত যা ছিল মোটামুটি সহনীয়, দেখলাম কফিল ঠিক থাকলে সবকিছু কষ্ট করে হলেও করা যায়। পরিবতর্ন শুরু ২০০৭ সাল থেকে। তা বাংলাদেশীদের জন্য। সব দেশীয়দের জন্য সব চালু, শুধু আমাদের ভিসা বন্ধ। কফিল পরিবতর্নের সুযোগ বন্ধ, সবদিক থেকে বঞ্চিত হওয়া শুরু আজ পর্যন্ত।

তারপর এখানকার ক্ষমতার পটপরিবর্তন। এদেশে শুরু হলো নতুন নতুন আইন। আমাদের দেশেও নতুন সরকার এলো। তারা চেষ্টা তদবির করলো ভিসা চালুর জন্য (এই চেষ্টার সময় কিছু লোক বিচ্ছিন্নভাবে এসেছে, এতে সরকারের কোন কৃতিত্ব নেই)। কাজের কাজ কিছু হয়নি, বরং বাংলাদেশিদের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা, কোথাও কফিল বদলের সুযোগ নেই। যে নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ আছে। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি, গতমাসে আমাদের কোম্পানি থেকে ১৩ জন মানুষ চাকরিচ্যুত হলো। তাদের মধ্যে ৪ জন বাংলাদেশী, বাকিরা ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক। সবাই সাক্ষাৎকার দিলো অন্য একটা ব্যাংকে, সবাইকে নিয়োগ দিলো, শুধু আমাদের দেশীয় ছাড়া। বলা হলো বাংলাদেশি নেবে না। কফিলের নিযাতর্ন বেড়ে গেলো। এখানকার শ্রম আদালতে মামলা করতে গেলে প্রথম উকিল নোটিশ দিতে হয় সংশ্লিষ্ট কফিলকে। তারপর নিজ দেশের কনসুলেট অফিস থেকে পেপার সংগ্রহ করতে হয়। সবচেয়ে বড় বিপত্তি এখানে, আমাদের দূতাবাস দিনের পর দিন পার করে দেয় একটা পেপারের জন্য, অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক মাসও চলে যাই। আর শ্রম আদালতে এবার যেতে মাসের পর মাস, বছরের কাছাকাছি মামলা শেষ হতে। অনেকে এইসব চোখ বুজে মেনে নেয় নিয়তি বলে।

এরপর ২০১৪ সালে আমাদের সরকার অনেক দেন দরবার করে রাজাদের রাজী করালো। তারা শর্ত দিলো মহিলা গৃহকমী দিলে আমাদের জন্য ভিসা দেবে। ভিসা দেয়া হলো পরিচছন্ন কর্মীর। এখনো ভিসা পাওয়া যায়, তবে এজন্য ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা দিতে হয়।

সৌদি সরকার ইতোমধ্যে চালু করেছে নিতাকাত প্রোগ্রাম। কোম্পানিগুলোতে শ্রেণীভেদ করলো। কোন কোম্পানিতে শতকরা কতভাগ সৌদি নাগরিক কাজ করতে হবে সেটা নির্ধারণ করে দিলো। কোটা পূরণ না হলে সেই সব কোম্পানির আকামা ( work permit) নবায়ন হবে না, তাদের লাইসেন্স নবায়ন হয় না। এই প্রোগ্রাম এখনো চলছে।

বিদেশি কর্মীরা পরিবার আনলে জনপ্রতি ১০০ রিয়াল দেয়ার নিয়মও চালু করা হয়েছে। সাথে আরো অনেক নিয়ম কানুন। এর কোনটিই কর্মীর পক্ষে নেই।

সবশেষে চালু করলো ১লা জানুয়ারি থেকে সবকিছুতে ৫% কর। যা চালুর আগে থেকে সবকিছুর দাম উধ্বর্মুখী। এখন চিন্তার বিষয় এতো খরচ বাঁচিয়ে কিভাবে নিজে চলবো আর দেশে টাকা পাঠাবো। সৌদির এই পরিস্থিতি কোথায় যাবে আল্লাহ জানে!

Recommended For You