সন্দ্বীপ: ফিরে দেখা ২০১৭

লালবোট দুর্ঘটনা বনাম সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন

সঙ্কট থেকে সম্ভাবনার হাতছানি

সালেহ নোমান (আবাসিক সম্পাদক, চট্টগ্রাম): সন্দ্বীপের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবহুল বছর ২০১৭। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা ঘটনায় আলোড়িত ছিলো সন্দ্বীপের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন। ঘটনার বেশিরভাগই ছিলো সঙ্কটের। কিছু কিছু ঘটনা দ্বীপের আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। রাজনীতির অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচনার বিষয় ছিলো ঠ্যাংগার চরে রোহিঙ্গা পূনর্বাসন, ঠ্যাংগার চরকে নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলার অন্তর্ভূক্তকরণ, গুপ্তছড়া ঘাটে লালবোট উল্টে ১৮জন নিরীহ সন্দ্বীপবাসীর প্রাণহানি, হরিশপুরে যুবলীগ নেতা বাবলু হত্যা ও উড়ির চর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরনবী মামুন নিখোঁজ হওয়া, কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে স্পীড বোটের ভাড়া কমানো ও সাবমেরিন ক্যাবলে বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়গুলো। সন্দ্বীপের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবহুল বছর ২০১৭। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা ঘটনায় আলোড়িত ছিলো সন্দ্বীপের ও উড়ির চর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নুরনবী মামুন নিখোঁজ হওয়া, কুমিরা- গুপ্তছড়া ঘাটে স্পীড বোটের ভাড়া কমানো ও সাবমেরিন ক্যাবলে বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়গুলো। বছরের শুরুতে দলের অভ্যন্তরীন প্রতিপক্ষের শক্ত প্রতিদ্বন্ধীতার মুখোমুখি হলেও বছরের শেষ দিকে এসে সন্দ্বীপের রাজনৈতিক  ও প্রশাসনিক অঙ্গনে অনেকটা একক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা। বিপরীতে বছরের শেষ দিকে এসে অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন সাংসদ মিতার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সন্দ্বীপ পৌরসভার মেয়র জাফর উল্যাহ টিটু।

বিদায়ী বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের একটি টিম ঠ্যাংগার চর পরিদর্শনে যাওয়ার পর এই বিষয়ে নড়াচড়া শুরু হয় সন্দ্বীপবাসিদের মধ্যে। পরপর দেশি- বিদেশি আরো কয়েকটি সংবাদ সংস্থা ঠ্যাংগার চর পরিদর্শন গিয়ে সেখানে রোহিঙ্গা পূন:বাসনের বিষয়ে সংবাদ প্রচার করে। শেষ পর্যন্ত সন্দ্বীপের দক্ষিন- পশ্চিম বরাবর জেগে উঠা চরটি নোয়াখালি জেলার অর্ন্তভ’ক্ত হয়ে যাচ্ছে এমন ধারনা সুস্পষ্ট  হতে থাকে। চরটি  সমুদ্র গর্ভে বিলিন হয়ে যাওয়া সন্দ্বীপের সাবেক ইউনিয়ন ন্যায়ামস্তি দাবি করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারী নজিরবিহীন কর্মসূচি পালন করে দক্ষিন সন্দ্বীপের কয়েকটি ইউনিয়নের বান্দিারা। তারও আগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত সন্দ্বীপবাসীরা একাধিক কর্মসূচী পালন করে। একপর্যায়ে ভুমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ওই চর সফর করে সন্দ্বীপবাসির দাবির প্রতি সম্মান দেখানোরও ঘোষণা দেন। কিন্তু বৈরি আবহাওয়ার কারনে ভ’মি প্রতিমন্ত্রী আর ঠ্যাংগার চর যেতে পারেননি। সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতাও জাতিয় সংসদে এই বিষয়ে সন্দ্বীপের সাধারন মানুষের দাবি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। কিন্তু তাতে ঠ্যাংগার চর নোয়াখালি জেলার অর্ন্তভ’ক্তির বিষয়ে সরকারের পূর্বের সিদ্ধান্তের কোন পরিবর্তন হয়নি। অক্টেবার মাসে আবারো একই দাবিতে দক্ষিন সন্দ্বীপের বাসিন্দারা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করলেও তাতে পূর্বের কর্মসূচীর মতো সাড়া মিলেনি।

ঠ্যাংগার চর ইস্যূ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যদিয়ে ঘটে গেলো বছরের ২এপ্রিল গুপ্তছড়া ঘাটে লালবোট উল্টে প্রান যায় ১৮জন নিরীহ সন্দ্বীপবাসির। ওইদিন সন্ধ্যায় বিআইডাব্লিউটিসির সী-ট্রাক থেকে তীরে যাওয়ার সময়  ৫০/৬০জন যাত্রী বোঝাই লালবোটটি উল্টে যায়। ¯্রােতের টানে ভেসে যাওয়াদের মধ্যে ১৮জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। চরম ঝুঁকি নিয়ে মূল ভুখন্ডের সাথে যাতায়ত করা সন্দ্বীপের মানুষের এই ধরনের দূর্ঘটনার আশংকা ছিলো অনেকদিন ধরে। কিন্তু আকস্মিক দূর্ঘটনায় প্রানহানিতে শোকে স্তব্দ হয়ে পড়ে সন্দ্বীপের বাসিন্দারা। বোট ডুবিতে প্রানহানির জন্য দায়ি ব্যাক্তিদের চিহ্নিত করতে গঠিত হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি দোষি ব্যাক্তিদের। শুধু তাই নয়, এতবড় দূর্ঘটনার পরও বলা যায় পূর্বের মতই ঝুঁকি নিয়ে সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের সমুদ্র পথে চলাচল করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক  ও সাংস্কৃতিক সংগঠন  নিরাপদ নৌ চলাচলের দাবিতে আন্দোলন করলেও তাতে উল্লেখ করার মত কোন ফল আসেনি। লালবোট ডুবির ঘটনায় টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কুমিরা- গুপ্তছড়া ঘাটের ইজারাদার আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যান ‘উইকলী সন্দ্বীপ’এ দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ঘাটের ব্যাবসা ঠিক রাখতে সন্দ্বীপের এক শীর্ষ নেতাকে  মোট ৬৫লাখ টাকা দিয়েছিলেন। যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় সন্দ্বীপে।

নভেম্বর মাসে গুপ্তছড়া ঘাটে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জেটি নির্মানের কাজ শুরু হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এই জেটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মাহফুজুর রহমান মিতা এমপি এবং সাংবাদিক সারওয়ার সুমন কুমিরা- গুপ্তছড়া রুটে স্পীড বোটের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তব্য রাখেন। ওই অনুষ্ঠানে মন্ত্রী শাহজাহান খান স্পীড বোটের ভাড়া ২’শ টাকা ঘোষণা করে অবিলম্বে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ পহেলা জানুয়ারী ২০১৮সাল থেকে  স্পীড বোটের ভাড়া বর্তমানের তিন’শ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫০টাকা কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মন্ত্রীর নির্দেশ পুরোপুরি কেন কার্যকর করা হয়নি তা জানা যায়নি।

বছরের মাঝামাঝিতে সন্দ্বীপের  রাজনৈতিক অংগন ও আইন- শৃংখলা পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠে। দলীয় অভ্যন্তরীন কোন্দলের জের ধরে প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হন পৌরসভা যুবলীগ নেতা সোহেল রানা বাবলু। কাছাকাছি সময়ে সেনের হাটের পাশে আরেক যুবলীগ নেতা বাবলু প্রকাশ লোহা বাবলু প্রতিপক্ষের হাতে গুরুতর আহত হয়। মূলত: রহমতপুর ঘাট ও হরিশপুর এলাকায় ইলিশ ঘাটের আধিপত্য নিয়ে এই হত্যাকান্ড ঘটে বলে ব্যাপকভাবে ধারনা করা হচ্ছে। এই দুই বাবলুই অভ্যন্তরীন গ্রুপিং এ এমপি মিতার অনুসারি হিসেবেই পরিচিত।   সোহেল রানা বাবলু হত্যাকান্ডের আগে থেকেই অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ছিলো টিটু গ্রুপ। বিশেষ করে লোহা বাবলুর উপর হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে টিটু গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ ক্যাডার বাউরিয়ার জাফরকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে বেদম পিটুনির ভিডিও প্রকাশ হয়ে পড়লে মাঠ ছাড়ে তার অন্য সহযোগিরা। সোহলে রানা বাবলু খুন হওয়ার পর টিটু গ্রুপের অবশিষ্ট ক্যাডার এবং অনুসারিরাও  পুলিশি অভিযানের মুখে গাঁ ঢাকা দেয় রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে।

বিদায়ী বছরের ১২মে সন্দ্বীপের উড়ির চর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরনবী মামনু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ব্যাপক তোলপাড় তুলেছিলো। নোয়াখালির কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একটি মাজার থেকে দুই মাইক্রোবাস যোগে এসে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মামুনকে ধরে নিয়ে যায়। মেয়র টিটুর অনুসারি উড়ির চরের অত্যন্ত প্রভাবশালি নুরনবী মামুনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় অশান্ত ছিলো সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন এই ইউনিয়ন।

বছরের একবারে শেষ দিকে এসে সন্দ্বীপে আলোচনায় উঠে আসে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগে কাজ শুরু হওয়ার বিষয়টি। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সন্দ্বীপে জাতিয় গ্রীডের বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ক্যাবল বসানো শুরু করে চীনের বিশেষজ্ঞরা। ৩৩কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালনে সক্ষম এই ক্যাবল দিয়ে সন্দ্বীপে প্রতিদিন ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। তবে, চাহিদানুযাী শুরুতে দিনে আট মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন শেষ হবে ২০১৮এর জুনে। এই ক্যাবলে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে ২০১৯এর জানুয়ারীতে। দুটি সাব স্টেশনসহ সন্দ্বীপে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৪৫কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন।

সন্দ্বীপের ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা জাতিয় গ্রীডের বিদ্যুৎ সংযোগের কৃতিত্ব নেওয়ার প্রবণতাও সন্দ্বীপবাসির মনযোগ আকর্ষণ করেছে। সাবমেরিন ক্যাবল বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য এমপি মিতার একক কৃতিত বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে তার অনুসারিরা। অন্যদিকে এমপির মিতার প্রতিপক্ষ প্রচার করছে, সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের একক কৃতিত্ব সাবেক বিদ্যুৎ সচিব সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান মনোয়ার হোসেনের। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সহ-সভপতি, সন্দ্বীপ এসোসিয়েশান চট্টগ্রামের সভাপতি এ কে এম বেলায়েত হোসেন সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের কৃতিত্ব মানোয়ার হোসেনের বলে নিজের ফেসবুক পেইজে পোষ্ট দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলে বিভিন্ন মহলে। ওই পোষ্টে মানোয়ার হোসেনের উদ্বৃতি দিয়ে বেলায়েত হোসেন আরো বলেন, একটি মহল দশ শতাংশ ঘুষ দাবি করায় প্রকল্পটি এক পর্যায়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সরকারের উর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে প্রকল্পটি স্বাভাবিক গতিতে অগ্রসর হয়।

গেলো বছরে সন্দ্বীপে বিএনপির নেতারা অনেকটা নিরবে তাদের দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে গেছেন। বিশেষ করে তাহের- জামসেদ কমিটির তৎপরতা খুব একটা দৃশ্যমান ছিলোনা। বিপরীতে সাবেক এমপি ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সহ সভাপতি মোস্তফা কামাল পাশা ও তার অনুসারীরা বেশ কয়েকটি কর্মসূচী পালন করেছেন। তাছাড়া মোস্তফা কামাল পাশা বছররের প্রায় পুরো সময় সন্দ্বীপে অবস্থান করে দলীয় নেতা-কর্মীদের সংস্পর্শে থেকেছেন।

বছরের একেবারে শেষ দিকে এসে পূর্ব প্রান্তের বেড়ি বাধ পূন: নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলতে থাকায় সেখান থেকে হাজার হাজার ভূমিহীনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

বছরের শেষপাদে এসে মাদ্রাসাছাত্রী মিহার আত্মহনন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েেেছ। এঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এ সংবাদের উদ্দেশ্য নিয়েও সরকারী দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে সাংবাদিকদের। ঋণগ্রস্ত মিহার পরিবারে অভাব ছিলো। কিন্তু, তার মৃত্যু সেই অভাবের তাড়নায় কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন। সোনালী সন্দ্বীপ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ বলেছেন, নভেম্বর মাসের ঘটনা তারা জানার পর অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাত সব নীতি মানা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারী দলের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এ আয়োজন।

Recommended For You