লেখালেখিঃ মনে পড়ে এখনো

।। আবদুল হালিম নাসির ।।

নানুদের প্রতিবেশি কালু ধোপা বাড়ির দিকে গিয়েছিল পানিতে ভেসে আসা জিনিস খুঁজতে। সেখান থেকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে অজ্ঞান। প্রায় ঘন্টাখানেক পর নাকি তার জ্ঞান ফিরেছে। জ্ঞান ফেরার পর কালু ঘটনাটা বলেছে বলে দল বেঁধে মানুষ তাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। বাড়ীর প্রায় সব মানুষ দারুণ উত্তেজনা নিয়ে কামাল ওরফে কালুকে নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। ঘটনাটা শোনার আগ্রহ থাকলেও কেন যেন আমি কালুদের ঘরের দিকে যেতে পারছিলাম না। একদিন আগের মহাদূর্যোগ আমার মনের মধ্যে যে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে, কালুর ঘটনাটা ভয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আবদুল হালিম নাসির

বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঘটনা শুনে আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। ফজরের সময়। এখনো বেশ অন্ধকার। কালুর ডানহাতে দা বামহাতে লাঠি। জমি-আইল সব ডুবে আছে। চারদিকে ছোট-বড় গাছ, টিন, গৃহস্থালী সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কালু প্রয়োজনীয় জিনিসটা এক জায়গায় জড়ো করে রাখছে। অতি সাবধানে সামনে এগুচ্ছে। কয়েকটা খাট টেবিল ধোপা পুকুরে ভাসছে। কোমর পানিতে নেমে লাঠির সাহায্যে টেবিলটাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে থাকে। বুঝতে পারে, এটা টেবিল বা খাট না, হাত তুলে চিৎ হয়ে ভেসে থাকা লাশ। ভয়ের শীতল শিহরণ কালুর মেরুদন্ড বেয়ে নামতে থাকে। এসময়টাতে ক্রমশ চারদিক ফর্সা হয়ে আসার কথা। তার মনে হল, হঠাৎ করে দ্রুত অন্ধকার নেমে আসছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

দুপুরের পর জোয়ার এল। নানার কবরের পাশে একজন মোটা-লম্বা মহিলার লাশ। হয়তো তিনি শুকনো ছিলেন। হয়তো একারণে শাশুড়ির তির্যক বাক্যবাণে তাকে বিদ্ধ হতে হয়েছে। অথচ, আজ অনেক সাস্থ্য নিয়ে নিথর হয়ে শুয়ে আছে। শাশুড়ি কি এমন স্বাস্থ্য দেখে খুশি হতেন! তিনি কি খুশি হয়ে মনে মনে বলতেন, যাক শেষ পর্যন্ত আমার বৌমার স্বাস্থ্যটা একটু ফিরল!

কিছুতেই মহিলাটার ছবিটা মাথা থেকে নামছেনা। স্বজনেরা হয়তো জানতে পারবেনা জীবিত নাকি মৃত। হয়তো খুব খুঁজবে, তারপর নিরাশ হয়ে মৃত ভেবে নেবে। কিন্তু, মনের মাঝে ফেরার প্রতীক্ষা থেকে যাবে অনেক অনেকদিন।

বিকেলের দিকে বড় রাস্তার দিকে গেলাম। বেশকিছু কবর খোঁড়া হচ্ছে রাস্তার একপাশে। একসাথে চেনা-অচেনা অনেকগুলো মানুষকে কবর দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। অনুভূতিটা কি ঠিক বুঝতে পারছিনা। অসম্ভব মনে হলো সেখানে থাকাটা।
সন্ধ্যাটাকে খুব অচেনা মনে হলো। হু হু করে বাতাসটা কাঁদছিল। এতদূর থেকে সাগরের গর্জন শোনার কথা না। কিন্তু, শুনছিলাম। রাতে দুপুরের মত শুধুই কলা সেদ্ধ, অন্য সময় হলে খেতে পারতাম না, সে রাতে মোটেও খারাপ লাগছিলনা। অন্যসময় হলে চালাহীন ঘরে শুয়ে রোমাঞ্চিত হতাম; আজ অনেক মানুষের ভীড়েও ভয়টা কাটছেনা। ক্লাশ নাইনে পড়া একটা ছেলে ভয় পাচ্ছি বলাটা লজ্জার বিষয় মনে হলো। যত রাত বাড়ছে ভয়ও বাড়ছে। অথচ, এই আমি কত কত রাতে টাউন থেকে পদ্ম পুকুর পাড়ের প্রিয় বাড়িটাতে পৌঁছেছি। মাঝে মাঝে গা-টা ছমছম করে উঠেছে, চোখদুটো টর্চ লাইটওয়ালা মানুষ খুঁজে ফিরেছে, টর্চ লাইট ছাড়া কাউকে পেলেও স্বস্তি পেয়েছি; একদম কাউকে না পেলেও কখনো দোয়া- দরুদ পড়ে, কখনো উচ্চস্বরে গান গেয়ে ঠিকই বাড়ি পৌছে গিয়েছি, তেমন একটা ভয় পাইনি। একটা রাত অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে।

সেদিনের সকালটা অন্য দিনগুলোর মত ছিল। সেদিনের দুপুরটাতে আকাশ ছিল থমথমে। এমনতো অনেক সময় থাকে। দুপুরের পর মাইকিং হয়েছিল। দশ নম্বর বিপদ সংকেতকে কেউ পাত্তা দেয়নি। নানাবাড়ির তিন-চারটা বাদে বাকি ঘরগুলোর ছোটখাট ঝড়-ঝাপটা সামলানোর সক্ষমতা ছিলনা, তবু মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেনি। মনে হয়, দশ নম্বর বিপদ সংকেত কি মানুষ সেসময় বোঝেনি।
রাতে খেয়ে শুয়েছিলাম, ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। শোঁ শোঁ আওয়াজ। ঘুম ভেঙ্গে গেল। ক্যাচক্যাচ শব্দে ঘরটা দুলছিল, চৌকিটা কাঁপছিল। ঘরের টিন বাতাসে উড়ছে। বের হওয়া বিপদজনক, তবু আম্মা-নানুসহ সাবধানে দৌড়ে মিলিটারী মামার ঘরে গেলাম। এখানে আরো দু-এক ঘরের মানুষ জমা হয়েছে। বাতাসের গতি আরো বেড়েছে। সবার চেহারায় ভয়ের বিস্তার। অবস্থা সুবিধার মনে হলোনা, এখানেও থাকা যাবেনা। এমন বাতাস-এমন বৃষ্টি দেখিনি আগে। মানুষ যে যার মত নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। যেটা নিরাপদ নয়-যেটা কোনভাবে টিকে আছে সেটাকে নিরাপদ ভেবে তার দিকে মানুষ ছুটছে।

বাড়ির প্রায় সব মানুষ সামছু মামাদের ঘরে। দোয়া-দরুদ, জিকির চলতে থাকে উচ্চঃস্বরে। কোনো কিছুকে পাত্তা না দেয়া কেউ কেউ সাইক্লোন শেল্টারে যাওয়া উচিত ছিল মনে করে লেকচার ঝাড়তে থাকেন। এরই মধ্যে বাড়ির প্রায় ঘর বিধ্বস্ত। পুরুষদের মধ্যে কেউ একজন বলেন, বাশার মামার উল্টা ভি এর মত হয়ে পড়া ঘরটা এই মুহূর্তে তুলনামূলক বেশি নিরাপদ। অমনি মাঝপথের বিপদকে তুচ্ছ করে যে যার সন্তান-সন্ততি নিয়ে ছোটে সেই ঘরটার দিকে। সবাই ভেতরে থাকা হোগলা পাতায় গাদাগাদি করে বসে সবশক্তি দিয়ে চাল দুটিকে ধরে সর্ব্বোচ্চ আকুতি দিয়ে আল্লাহকে ডাকতে থাকে।

যেই ডালে বান্ধি বাসা ভাঙে সেই ডালের মত বেশীক্ষণ থাকা গেলনা সেথানেও। মানুষগুলোর মর্মস্পর্শী আর্তনাদ নিয়ে তীব্র বেগে পানি আসতে থাকে। ফখর মামার নতুন ঘরটাতে কেবল শনের ছাউনি বাকী। সবার সেই ঘরের মাচায় ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা। বাতাস সবকিছুকে উড়িয়ে নিচ্ছিল – উড়িয়ে নিতে চাইছিল মানুষগুলোকেও। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পেরেকের মত শরীরে ঢুকে যাচ্ছিল। আকাশ দেখার ফুরসৎ ছিলনা, একবার মনে হয় দেখেছিলাম, সে রাতের আকাশটা ছিল ব্যতিক্রমী লালচে। মনে হচ্ছিল বাঁচবনা। কিছু একটা গায়ে দিতে চাইছিলাম। মিলিটারী মামা ওনার বাহিনী থেকে পাওয়া কালো-মোটা-খসখসে কম্বলটা যতজনের গায়ে দেয়া সম্ভব জড়িয়ে দিলেন, বাকীরা মোটা কাঁথা গায়ে দিলেন। সবাই সবাইকে শক্ত করে ধরে আছে। কখন থামবে? সময়টা অনেক দীর্ঘ মনে হয়। মাচার নিচে পানির ¯্রােত – হালকা গরম পানি। সবাই আরো বেশী আতংকিত, পানি যদি বাড়ে! ঝড়টা থামে। পানি নেমে যায়। সবাই মাচা থেকে নামে। ভোর হয়ে আসে।

সে রাতে কোনো মানুষ ঘুমায়নি। ফজরে আশে-পাশের মসজিদের মুয়াজ্জিন আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম বলেনি। ভোরের আলোতে বিধ্বস্ত-শূন্য ভিটে দেখে সর্বশান্ত মানুষগুলোকে কেঁদে উঠতে দেখিনি। অনেক সময় বড় ঘটনায় মানুষ এভাবে বুঝি অনুভূতি শূন্য হয়ে যায়!
মানুষগুলো ভেসে যাওয়া-বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিস খুঁজতে থাকে। ডাঙায় উঠে আসা মাছ ধরে দারুণ খুশি হয়ে বর্ণনা দেয়। বাগানে পড়ে থাকা ফল কুড়ায়। কেউ বা পথের মাঝে পড়ে থাকা গাছ কাটতে থাকে। কেউ কেউ রাতে কোনোভাবে যাতে ঘুমাতে পারে সে আয়োজনে শরীক হয়। সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যন্ত, যেন সবাই গত রাতের বিপদ-কষ্ট সব ভুলে গেছে। এভাবে মানুষ সব সয়ে নেয়-নিতে হয়।

বাড়ির জন্য চিন্তা হচ্ছিল। বাড়ির লোকজনও নিশ্চয় বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ আমাদেরকে নিয়ে। বাড়ির লোকজন যে চিন্তিত ছিল বুঝলাম পরদিনই। চাচা পানিতে ডুবে থাকা ভাঙা রান্তা-ঘাট আর বিপদ সংকুল সাঁওতাল খাল পেরিয়ে হরিশপুর থেকে রহমতপুর এলেন। কষ্টগুলো নিমিষে উড়ে গেল, সুখগুলো দুম করে ভেতরে ঢুকে গেল অকৃত্রিম আন্তরিকতার পরশে। বিধ্বস্ত জনপদে আরো এলেন প্রধানমন্ত্রী, রঙ-বেরঙের হেলিকপ্টার-বিমান, নৌবাহিনীর জাহাজ, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বাহিনী, নানা ধরণের ত্রাণ। ঘটল অনেক ঘটনা-দূর্ঘটনা।
অনেককে সিদ্ধান্ত নিতে দেখেছিলাম সন্দ্বীপ ছাড়ার ব্যাপারে। সে তালিকায় নানুরাও ছিলেন। মামার জোরাজুরিতে নানুরা রাজেন্দ্রপুর চলে গেলেন। সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, কান্নার ঢেউ গভীর থেকে তীরের দিকে ছুটে আসছে। অবশ্য কান্নাটা অল্প কিছুদিনের মধ্যে অপার্থিব আনন্দে রূপ নিয়েছিল। নানুরা বেশীদিন রাজেন্দ্রপুর থাকতে পারলেন না, ফিরে এলেন মায়াঘেরা সন্দ্বীপে।
দূর্যোগের ভয় আছে, শিক্ষা-সাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রচুর সমস্যা আছে, বাহিরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা প্রকৃতির উপর নির্র্ভশীল-ভেতরেরটাও নাজুক, তবু মানুষ সন্দ্বীপ ছাড়তে চায় না। এখানে মমতাটা সুগভীর।
এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায়, প্রথম দেখা হোভারক্রাফ্ট, বিপি ফাইভ বিস্কুট, ৯১সালের ২৯শে এপ্রিল এবং তার পূর্ববর্তী-পরবর্তী সময়, আর সেসময়ের বিধ্বন্ত সন্দ্বীপকে।

লেখক সন্দ্বীপের হরিশপুরের সন্তান। কার্গিলিয়ান।
চট্টগ্রামের হালিশহরে থাকেন

Recommended For You