ম্যানহাটনে পাতালপথে বোমা

সোহেল মাহমুদ: বিতর্ক এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ম্যানহাটনে পাতালপথে বোমা হামলার ঘটনাকে কি বলা দরকার, বিতর্কটা সেটা নিয়ে। আটক আর গ্রেফতারের পার্থক্য বোঝা কিংবা খোঁজার সামর্থ যাদের নেই, তাদের কাছে বরং নেতিবাচকতা খুব গ্রহণীয়। সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসবাদ খুব আকর্ষণীয়। আবার যারা শব্দের এই দোলাচালকে জীবনাচারে প্রভাবদায়ী মনে করেন, তেমন গোষ্ঠী কিন্তু সন্ত্রাস আর উন্মত্ত অপরাধের মাঝে ব্যাপক পার্থক্য খুঁজে পান। অন্যরা? আকায়েদকে কি বলা যায়? সেকি সন্ত্রাসী, জঙ্গী নাকি অপরাধী? নাকি, শুধু সন্দেহভাজন? আমি যদি নিজ চোখে কাউকে খুনী হিসেবে দেখিও, আইন আদালত কিংবা নাগরিক দায়িত্ব কোনটিই আমাকে সেই ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে খুনী সাব্যস্ত করার অধিকার কি দেয়?
১১ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল সাতটা ২০ মিনিটের দিকে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সাত বছর ধরে নিউ ইয়র্ক শহরে বসবাসরত এই যুবক নিজের গায়ে বাঁধা বোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় টাইম স্কয়ার সাবওয়ে আর পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে যাবার সুড়ঙ্গপথে।
আকায়েদের বোমায় তার পেট পুড়ে গেছে। হাতও। শুরুতে পুলিশ আর ফায়ার ডিপার্টমেন্ট থেকে বলা হয়েছিলো আকায়েদের আঘাত গুরুতর নয়। পরে রাতে ভিন্ন বিবৃতিতে যা গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়। আঘাত যেমনই হোক, আকায়েদ জীবিত আছেন এবং পুলিশ বা তদন্ত দলের সাথে কথা বলতে পেরেছেন। এ ঘটনায় আহত আরো তিন পথচারীর আঘাত গুরুতর ছিলো না।

আকায়েদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আকায়েদের বিরুদ্ধে ৫টি ফেডারেল চার্জ আনা হয়েছে। ১. বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য কাজ করা। ২. ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা, ৩. জনচলাচলের জায়গায় বোমা বিস্ফোরিত করা, ৪. বিস্ফোরক বা আগুন দিয়ে সম্পত্তি ধ্বংস করা এবং ৫. হিং¯্র-অপরাধমূলক কাজে ধ্বংসাত্মক ডিভাইস ব্যবহার করা।
১০ পাতার এ অভিযোগপত্র মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট জাজ ক্যাথরিন এইচ পার্কারের আদালতে জমা দেয়া হয়।

অভিযোগপত্রের উল্লেখযোগ্য দিক
অভিযোগপত্রে কোথাও আকায়েদের পরিবার সম্পর্কে তথ্য দেয়া হয়নি। তার বাসার অবস্থান, বাবা-মাসহ অন্য কারোরই কোন তথ্য নেই এতে। নেই আকায়েদের কান্ট্রি অব অরিজিন কিংবা জাতীয়তা সম্পর্কেও কোন তথ্য। এতে বলা হয়নি আকায়েদ সন্ত্রাসী কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকা- করেছে। তাকে ‘বর্ণবাদী’ বলা হয়নি। বলা হয়েছে, সে অনলাইনে আইএস এর প্রপাগান্ডার মাধ্যমে সেল্ফ মোটিভেটেড হয়েছে।

আকায়েদকা এবং বাংলাদেশ কমিউিনিটির প্রতিক্রিয়া
যন্ত্রমানবী সোফিয়ার ঝড়ে যখন বাংলাদেশীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কাঁপছে, ঠিক তখনি নতুন ইস্যু আকায়েদ। সোমবার থেকে শুরু হওয়া ঝড় এখন খানিকটা থিতু, তাও পাল্টা বক্তব্য জোরালো হবার কারণে। আকায়েদকে সন্ত্রাসী, জঙ্গীসহ নানা বিশেষণে আখ্যা দিয়ে চলছিলো তার চৌদ্দগোষ্ঠি ধোলাইপর্ব। কিন্তু, সচেতনমহল থেকে এ নিয়ে লেখালেখির কারণে এ উত্তেজনায় খানিকটা ভাটা পড়েছে।
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে আকায়েদকে বর্জন আর বহিষ্কারের ডাকও দিয়ে ফেলেছিলেন কোন কোন মহল। এরপর, তাকে বিএনপি নেতা বানিয়েও জল ঘোলা করার একটা কসরৎ হয়েছে কোন কোন মহল থেকে। তবে, এর সবকিছুই এখন থিতু বলা চলে। উত্তেজনা, আবেগ আর ক্ষোভের আপাত পরিসমাপ্তি হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। হয়তো নতুন কোন ইস্যুতে আবার অন্তর্জালের মাঠ গরম হবে।

ব্রুকলিনের সমাবেশ
আকায়েদকা-ে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকা ছিলো ব্রুকলিনে বাংলাদেশ কমিউনিটির। শুরুতে প্রতিক্রিয়ার উপায় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও মঙ্গলবার (১২ ডিসেম্বর) চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এভিনিউতে গ্রীন হাউস রেস্তোরায় আয়োজন করা হয় সচেতনা-সমাবেশের। সেখানে স্থানীয় এসেম্বলিম্যান, কাউন্সিল মেম্বারসহ অনেকে যোগ দেন। এর পরের সমাবেশটি হয় ১৫ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ যোগ দেয় এতে। সোমবারের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে এটিই ছিলো সবচেয়ে বড় সংহতি সমাবেশ, যাতে বিভিন্ন ধর্মের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। স্টেট এসেম্বলিম্যান, কাউন্সিল মেম্বার, স্টেট এসেম্বলির ডেপুটি স্পিকারসহ এসেছিলেন অসংখ্য মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনের নেতা কর্মীররা। সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে আকায়েদের ঘটনা নিয়ে জনমনে যে শঙ্কা আর ভয়, সেটি দূর করার কথা বলেছেন তারা। বক্তারা কমিউনিটির ভেতরে ­­ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন।

Recommended For You