বৃন্তচ্যুত ফুল

।। নিগার হারুন পাপ্পু ।।

‌শৈশ‌বের কথা। ঈদ এর সময় চাচা বা‌ড়ি অাস‌তেন। তখন তি‌নি বিশ্ব‌বিদ্যালয় এ প‌ড়তেন। অং‌কের মেধাবী ছাত্র। সুদর্শন, গৌর বর্ণ। দেবদারুর মত গড়ন। অাকর্ষণীয় অাকৃ‌তি। উচ্ছল, হা‌সিখু‌শি।
অামা‌দের জন্য এটাওটা নি‌য়ে অাস‌তেন। একবার অামার জন্য কলম অার কি যেন এনে‌ছেন। বল‌লেন, ভা‌লো ফলাফল ক‌রেছ তাই কলম উপহার দিলাম। ঝর্ণা কলম ছি‌লো ওটা, দামীও।

চাচা অার ওনার ফুফা‌তো ভাই পান্না কাকা এক‌সাথ হ‌লেই হৈহু‌ল্লোড় জ‌মে উঠ‌তো। অাম্মা ওনা‌দের বড় ভাবী। অাম্মা‌কে ক্ষেপা‌তেন সবসময়। অামার খালারা য‌দি কেউ থাক‌তেন ত‌বে তাঁদের‌কে অতিষ্ঠ ক‌রে তুল‌তেন দুষ্টু‌মি কর‌তে কর‌তে। এছাড়া অা‌শেপা‌শের লোকজন নি‌য়ে অাড্ডা জ‌মি‌য়ে তুল‌তেন।
চাচা চলা‌ফেরায় বেশ কেতাদুরস্ত ছি‌লেন। বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে অাকর্ষকগণ্য‌দের তি‌নি মধ্যম‌ণিও ছি‌লেন।
সৎ মা‌য়ের অসহ‌যো‌গিতার কার‌ণে তি‌নি বিমান চাল‌কের পেশায় যোগ দি‌তে পা‌রেন‌নি। অার তা‌তে তাঁর অাশৈশব অ‌ভিমান অা‌রো ঘণীভূত হ‌য়ে‌ছি‌লো। সে থে‌কে তি‌নি বা‌ড়ি যাওয়া বন্ধ ক‌রে‌ছি‌লেন।
অামরা শহ‌রে এলে তাঁ‌কে দে‌খে যেতাম। এরপ‌রে তি‌নি ব্যবসায় নে‌মে‌ছি‌লেন। হঠাৎ মান‌সিক রোগাক্রান্ত হ‌য়ে তি‌নি ব্যবসা ছাড়‌লেন। বি‌য়ে কর‌লেন। ঐ অবস্হায় তি‌নি কো‌চিং চালু কর‌লেন। হা‌লিশহ‌র,বৌবাজার এবং অাশপা‌শের এলাকায় তি‌নি বেশ জন‌প্রিয় একজন ব্য‌ক্তিত্ব।

‌মে‌ট্রিক পরীক্ষার অা‌গে অা‌মি তিনমাস ওনার হা‌লিশহ‌রের বাসায় ছিলাম। তি‌নি অংকটা দে‌খে দে‌বেন, এটাই ছি‌লো উদ্দেশ্য। তখন তি‌নি বিরল এক রো‌গে অাক্রান্ত। কোথাও যান না, টি‌ভি দে‌খেন না, নিউজ‌পেপার প‌ড়েন না। কোন দূর্ঘটনা বা মৃত্যু সংবাদ শুন‌তে পা‌রেন না। ওনার খাবার অালাদা। চো‌খের সাম‌নে রান্না এবং বি‌শেষ পদ্ধ‌তি‌তে খাবার গ্রহণ। এর ম‌ধ্যে ওনার ঘরভ‌র্তি থা‌কে ছে‌লে‌মে‌য়ে‌তে। একদল অা‌সে তো অা‌রেকদল যায়। বসার জায়গা দি‌তে পা‌রেন না। দাঁ‌ড়ি‌য়ে দাঁড়ি‌য়েও পড়‌ছে। অ‌ভিভাবকগণ তবু না‌ছোড়বান্দা। ওনা‌দের ছে‌লে‌মে‌য়ে‌দের পড়া‌তেই হ‌বে। তাঁর পড়া‌নোর কায়দায় এক ধর‌নের জাদুর ছোঁয়া ছি‌লো। একবার একটু বু‌ঝি‌য়ে দি‌য়ে তি‌নি ভিত‌রে গি‌য়ে শু‌য়ে পড়‌তেন। ওখান থে‌কে নাম ধ‌রে ডে‌কে ডে‌কে যার যার সমাধান দি‌য়ে দি‌তেন। ছাত্রছাত্র‌দের নি‌য়ে গল্প, কৌতুক, অাড্ডায় মেতে ওঠ‌তেন। নি‌জের চো‌খে না দেখ‌লে বিশ্বাস হ‌তো না এসব।
অাজ‌কে ওনার অসংখ্য ছাত্রছাত্রী‌দের ম‌ধ্যে সমা‌জের সবস্ত‌রের শীর্ষপদে অাসীন অা‌ছেন অ‌নে‌কে।
‌তো, অা‌মি যখন সেখা‌নে থাকা শুরু ক‌রি তখন অামা‌কে ডে‌কে নি‌য়ে সবার সা‌থে প‌রিচয় করা‌তেন। কখ‌নো ও‌দের সা‌থে পড়‌তে ব‌সি‌য়ে দি‌তেন। অামার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছি‌লেন তি‌নি।
তাঁর এই অসুস্হ থাকাকা‌লে চাচী যে কি অমানু‌ষিক খাটু‌নি খে‌টে‌ছেন তা অাজকাল বিরল। চাচার জন্য ভোর পাঁচটায় ওঠ‌তেন, রা‌তে কখন ঘুমা‌তেন তার কোন ঠিক ছি‌লো না। কখ‌নো কখ‌নো চাচী‌কে অশ্রুসজলও দেখ‌তে পেতাম।
‌অা‌মি থাকাবস্হায় দীর্ঘ‌রোগ‌ভো‌গের পর চাচা‌ তাঁর মু‌শি‌র্দের দোয়াধন্য হ‌য়ে ক্রমশ সুস্হ হ‌তে লাগ‌লেন। ঘর থে‌কে বের হওয়ার সাহস হ‌লো। মি‌ডিয়া ভী‌তি ক‌মে গে‌লো। সবরক‌মের সংবাদ শুন‌তে নিজ‌কে তৈরী কর‌লেন। অামরাও স্ব‌স্তির নি:শ্বাস ফেললাম।
অা‌মি যখন ওনার বাসায় ছিলাম তখন তি‌নি অামা‌কে বাজা‌রে পাঠা‌তেন। বল‌তেন, হেঁ‌টে যা‌বি, হেঁ‌টে অাস‌বি। স্বাস্হ্য ভা‌লো থাক‌বে। বাজার কর‌লে অ‌ভিজ্ঞতাও বাড়‌বে। সাংসা‌রিক বু‌দ্ধি থাকা দরকার।
ওনার ছাত্র‌দের ম‌ধ্যে অ‌নে‌কে অামার বন্ধু হ‌য়ে ও‌ঠে। পরবর্তী‌তে শহর কে‌ন্দ্রিক বন্ধুমহ‌লের ডালপালা ছড়ায় ওই বন্ধু‌দের মাধ্য‌মে।
অবসর পে‌লেই তি‌নি কৌতুক মেশা‌নো র‌সে গ‌ল্পে মে‌তে ওঠ‌তেন।
‌অা‌মি ঘুম থে‌কে ও‌ঠেই গান শুন‌তে পেতাম। লতার গাওয়া হারা‌নো দি‌নের গান শুন‌তেন বে‌শি, সেই সা‌থে অন্য শিল্পী‌দের গানও শুন‌তেন।
অাজ‌কেও ঘুম থে‌কে উঠে‌ছি। ত‌বে কোন গান শু‌নি‌নি। শোনলাম, চাচা অার নেই। একরা‌তের রোগভো‌গে তি‌নি শেষ‌নি:শ্বাস ত্যাগ ক‌রে‌ছেন।
গতকাল থে‌কেই মনটা কেমন জা‌নি হ‌য়ে গি‌য়ে‌ছি‌লো। ক‌য়েক‌দিন অা‌গে দেখলাম মন খারাপ করা স্বপ্ন। অার অাজ সকা‌লে চূড়ান্ত সংবাদ কা‌নে এলো।
চাচা, যেখা‌নেই থাকুন, ভা‌লোই থাক‌বেন; এই দৃঢ় বিশ্বাস অা‌ছে অামার ম‌নে।
বাপচাচাফুফু‌দের বৃক্ষ থে‌কে জীবনফুল বৃন্তচ্যুত হ‌য়ে ছিঁ‌ড়ে পড়‌ছে। এরপর অামা‌দের পালা। জীবন থে‌কে জীবন খ‌সে পড়ার গল্প!

লেখক সন্দ্বীপের সন্তান। তার চাচা এ ডি এম ইউসুফ আনোয়ার বাবুল স্মরণে এ লেখা। ৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ইন্না….রাজিউন।

Recommended For You