বাঙালির কবি আবদুল হাকিম

আলী হায়দার চৌধুরী

আলী হায়দার চৌধুরী

বাংলা ও বাঙালি বিষয়টি হাজার বছরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারক। ভাষার সাথে জাতিসত্ত্বা নিঃসন্দেহে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তিরিশ শতকে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে জ্ঞানতাপস ব্যক্তিদের যে সম্মেলন হয়েছিল সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতিমান পন্ডিতরা (আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ এতদাঞ্চলের পন্ডিতজন) তাঁদের বক্তব্যে ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও তার বিকাশমান ধারা বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয়েছে যে, সুদূর অতীত থেকে আধুনিককালের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত প্রায় সবাই তাঁদের সাহিত্যে দেশ, জাতি ও মাটির বন্দনা করেছেন, জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি কবি-সাহিত্যিকদের অবদানে পুষ্ট হয়েছে। সমৃদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু যুগে যুগে প্রগতিশীল ক্ষুরধার লেখকদের বিরুদ্ধে এক শ্রেণীর ধর্মীয় আলখেল্লাধারীরা বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ করেছেন এমনকি কাফের ফতোয়া দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। কিন্তু প্রগতির অমিয়ধারায় কলকল স্রোতে বহমান নদীর মত জাগরিত হয়েছে, এমনকি চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে সত্যের আলোয় আলোকিত হয়েছে।
কবি আবদুল হাকিম তেমনি একজন প্রাগ্রসর চেতনার মরমী কবি, যিনি মায়ের ভাষার অবমাননাকে তীব্র আক্রোশে প্রতিরোধ করেছেন, স্বজাতির ভাষার অধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন।

ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের মতে, ১৬২০ সালে বঙ্গপোসাগরের দ্বীপ সন্দ্বীপ এর এক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন মহাকবি তথা বঙ্গকবি আবদুল হাকিম। তাঁর পিতার নাম শাহ্ আব্দুর রাজ্জাক। তাঁর জন্ম গ্রামের নাম ছিল সুধারাম।

ভাঙ্গনের কবলে পরে কবির গ্রাম বহুকাল আগে সন্দ্বীপের মানচিত্র তেকে বিলীন হয়ে গেছে। তাঁর এই সুধারাম নোয়াখালীর সুধারাম হবার কোন কারণ নেই। সন্দ্বীপের এই সুধারামের সময় নোয়াখালীর সুধারামের সৃষ্টিই হয়নি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সন্দ্বীপ। দিকে দিকে অবারিত মাঠ আর সবুজের সমারোহ। নারিকেল সুপারি বিথী শোভিত গ্রাম, জলাশয় আর বিক্ষুব্ধ সৈকত। প্রাচীনকাল থেকে ভাঙ্গনপ্রবণ সন্দ্বীপের লোনা পানি আর আলো-হাওয়া গায়ে মেখে বেড়ে ওঠেছেন কবি। তাঁর মনের বিকাশ হয়েছে। এই অনবদ্য প্রাকৃতিক পরিমন্ডলে থেকে কাব্যরচনা করেছেন কবি স্বদেশের ভাষায়। কাব্য সাহিত্যের যে চর্চা বঙ্গকবি আবদুল হাকিম করেছিলেন সেই যুগটি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত। প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিল এক কাল্পনিক ব্যাপার। তাই সে যুগে তাদের সাহিত্যকর্ম ছিল কলমের লেখনী দিয়ে।

মহাকবি আবদুল হাকিম বাঙালী জাতীয়তাবোধের এক দিকপাল। অনেক কাব্যগ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন কিন্তু যুগের আবর্তে তার অনেক পান্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া যয়নি। ত্রিপুরা রাজ্য থেকে শুরু করে বাকরগঞ্জ জেলা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে যে সব গ্রন্থ উদ্ধার করা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ ১. নূরনামা, ২. লালমতি সাইফুলমূলক, ৩. নছিহতনামা, ৪. ইউসুফ-জুলেখা, ৫. সিহাবউদ্দিননামা, ৬. শহরনামা, ৭. কারবালা, ৮. চারিমোকাম ভেদ। এসব মহামূল্যবান কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যকে করেছে অনেক সমৃদ্ধ। তার প্রগতিশীল সাহিত্য কর্মের জন্য তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

সে সময়ে অনেকেই বাংলা ভাষায় কাব্য চর্চাকে অধর্ম মনে করত। তাঁর সমকালিন কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে সৈয়দ সুলতান, নসরুল্লা খান, মাহমুদ খান, হাজী মোহাম্মদ, শেখ মোতাল্লেব বাংলা ভাষায় ধর্মীয় তত্ত প্রচার করতে গিয়ে অনেক লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এমনকি সৈয়দ সুলতানকে নানা রকম ফতোয়ার বানে জর্জরিত করেছিল। নাস্তিক আর আস্তিকতার তত্ত্ব থেকে পরিত্রান পায়নি সেই যুগের প্রগতিশীলেরা। এই সমস্যা কবি আবদুল হাকিমের বেলায় চরম আকার ধারণ করেছিল। তিনি কট্টর মুসলমানদের তার কাব্য দিয়ে বুঝিয়েছিলেন যে, “সৃষ্টিকর্তা যে কোন ভাষাতেই মানুষের মনের কথা বুঝতে সক্ষম। যদি তা-ই হয় তাহলে বাংলাতে ধর্মের কথা বললে আপত্তি কোথায়”।

বাংলা ভাষা বিদ্বেষীদের প্রতি রুষ্ঠ হয়ে তার “নূরনামা” গ্রন্থে কবি লিখেছিলেন
“যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবানী,
সেসবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুরাই
নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ ন যায়”।

কবির মনে বাংলা ভাষা বিরোধীদের প্রতি খুব বেশি ক্ষোভ না জাগলে এত কঠোর কথায় তাদেরকে বিদেশ চলে যাওয়ার উপদেশ দিতেন না। তার লেখার মূল প্রতিপাদ্য ছিল নিজ ভাষা এবং নিজ সংস্কৃতি যতক্ষণ না সমাজ, দেশ হৃদয়ঙ্গম না করবে ততদিন সমৃদ্ধি আসবে না। তাদের সেই লেখনির বাস্তবচিত্র আমরা খুঁজে পেয়েছি ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। তিলতিল করে এগিয়ে যাওয়ার প্রগতি পতাকাকে সমুন্নত রেখে বাঙ্গালী জাতিকে জাগিয়ে তোলার যে প্রেরণা আবদুল হাকিম দিয়েছিলেন ৫২ থেকে ৭১ তার-ই বহিঃপ্রকাশ। আবদুল হাকিমের স্বপ্ন স্বার্থক হয়েছে। আজও তার বিক্ষুব্ধ অথচ বাঙালিত্বের অমিয়বাণী প্রতিটি বাঙ্গালীর প্রাণে উচ্চারিত হচ্ছে “যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী” ……।

কবি মীননাথ, যার হাতে রচিত হয়েছে চর্যাপদের প্রথম কবিতা, যিনি বাংলাভাষার আদিকবি- জন্মেছেন এই সন্দ্বীপে। সংস্কৃত ‘মহাভারত’ এর বাংলায় প্রথম অনুবাদ হয়েছে ছুটি খান ও পরাগল খাঁর যুগপথ নেতৃত্বে ও নির্দেশনায়Ñ যাদের মাতৃভূমি সন্দ্বীপ। শোষিত, সর্বহারার জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের তথা সাম্যবাদের ভারতীয় ধারার প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মজাফফর আহমেদ জন্মেছেনÑ সন্দ্বীপে। সন্দ্বীপে জন্মেছেন বৃটিশ যুগের বিপ্লবী লালমোহন। কৃষক বিদ্রোহের নায়কÑ আবু তোরাব।

সন্দ্বীপে জন্মেছেন একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদ, স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরী।

বাংলাসাহিত্যের সূচনায় ও বিকাশে, বাংলাভাষার অনুবাদ সাহিত্যের অন্তর্ভুক্তিতে, বাংলাভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়, স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে রতœপ্রসারিনী সন্দ্বীপের সন্তানদের অবদান অগ্রগণ্য ও অনন্যসাধারণ। বঙ্গকবি আবদুল হাকিম সেই সন্দ্বীপের অহংকারÑ এবং সারাবিশ্বের বাঙালী জনমানসে মাতৃভাষাপ্রেমের উদ্বোধক।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক। সন্দ্বীপের সন্তান।

Recommended For You