প্রসঙ্গ আকায়েদকাণ্ড: ভালো থাকুন, ভালো রাখুন

কাজী ফৌজিয়া: আজ অনেকদিন পর লিখতে বসলাম। চারদিকের অবস্থা দেখে চুপ থাকা সম্ভব নয়। গত সোমবার ১১ই ডিসেম্বার সকালে ম্যানহাটন পোর্ট অথরিটির ঘটনা নিঃসন্দেহে কারো কাম্য নয়। আমাদের নিউইয়র্কসহ পুরো বাংলাদেশি সমাজের জন্য দুখঃজনক।
এই ঘটনার পরে নিউইয়র্কের বাংলাদেশী সমাজ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে সেটা কি ঠিক? আমার লিখাটির সেই সব প্রতিক্রিয়ার আলোকে লিখা। ঘটনার পর আমাদের চিন্তা শুরু হয় আইন কানুন সংস্থার নজরদারী, ট্রাম্প প্রশাসন এর ইমিগ্রেশন বা মুসলিম নীতির উপর আঘাত বা সাদা আধিপত্যবাদীদের ঘৃণা কোন দিক সামাল দিব। অবাক করা বিষয় বাংলাদেশীদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সর্বপ্রথম আঘাত নিজের সমাজ এর মানুষ থেকে আসল! অবাক হচ্ছেন? অবাক হবেন না, খুলে বলছি আমাদের দেশের মানুষ জন মিডিয়াতে ইন্টারভিউ দিয়ে ও বিভিন্ন সমাবেশ আর প্রেস কনফারেন্স করে বলছে তাদের বাংলাদেশের মান ইজ্জত শেষ করে দিয়েছে এই আকায়ে়েদ। অহ রিয়ে়লি! আপনারা বলতে চাচ্ছেন এক আকায়ে়দ পুরা বাংলাদেশ কে প্রতিনিধিত্ব করে? আমি আপনি আমরা কেউ না বাংলাদেশের ? আরেকটি বিষয়় কেউ বলছে সে সন্দ্বীপের কেউ বলছে সে সন্দীপে পালিত না ঢাকায়় থেকেছে! কেউ বলছে সে বি এন পি করত ! কেউ বলছে তার পরিবার এর লোকজন বাংলাদেশে জামাত করে।কেউ বলছে সে মুনা করত! মুন,বিএনপি এইসব অভিযোগ খ-ন করছে। এই সব করে আমরা কি প্রমাণ করতে চাচ্ছি ? যারা আমাদের টার্গেট বানাবে তাদের কিছু আসে যায় সে কোথাকার! তারা কি কেয়ার করে না সে সন্দ্বীপের নোয়াখালির ! আইন কানুন সংস্থা দেখবে সে বাংলাদেশী। ট্রাম্প প্রশাসন দেখবে সে ইমিগ্রান্ট। সাদা আধিপত্যবাদ এর লোকজন দেখবে সে ব্রাউন নিজের চামড়া বাঁচাতে যে চেষ্টা করছেন তাতো বিফলে যাচ্ছে! যাচ্ছে! নিউইয়র্ক সিটির মেয়র, গভর্নর, র্পুলিশ প্রধান ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেউ বলেনি আকায়েদে বাংলাদেশী বা মুসলিম । আমরা বাংলাদেশী লোকজন সারাক্ষণ চিৎকার দিয়ে অস্বিকার করা গালি দেওয়া ঘৃণা করার যজ্ঞ চালিয়ে় দুনিয়াকে বলছি আকায়েদ বাংলাদেশী। আমারা ব্যানার পোষ্টার নিয়ে সমাবেশ করে বলছি আমরা আতঙ্কবাদকে সমর্থন করি না আর তাকে আমরা ঘৃণা করি! আমরা উঁচু গলায় তার শাস্তি দাবী করে চলছি। আমরা কেন বলছি কারণ, এখানকার মুল্ধারার মিডিয়া সন্ত্রাসবাদ এর সাথে বাংলাদেশের নাম বলছে। এই মিডিয়া সাদা সন্ত্রাসীর জন্য কখনো এমন করে বলে না! সাদা সন্ত্রাসী হয়ে যায় মানসিক রোগী। আর আমাদের সমাজ তথা মুসলিম সমাজ হলে আতঙ্কবাদী ! আর আমরা সেই মিডিয়ার পিছনে ভাগছি। সকালে এক সমাবেশ খবর পাই বিকাল হতে হতে ৪ সমাবেশ শুরু হয়। গত সোমবার থেকে সারাদিন ব্রুকলিনেই থাকছি খেয়াল রাখতে আইন কানুন সংস্থা যেন বাংলাদেশী লোকজন তাদের ব্যাবসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের লক্ষবস্তু না বানায় ও সভা সমাবেশ গুলির লক্ষ্য যেন না হয় নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুঁড়ি। এই ৫দিনের অভিজ্ঞতায় দেখলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতারা রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে হাজার গুন ভাল। আমাদের কিছু সাংবাদিক বন্ধু কিছু সামাজিক সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য নিয়েছে সেখানে যেভাবে তারা যেভাবে অতি উৎসাহী হয়ে ঐ ছেলের শাস্তি দাবী করল মজার বিষয় একজন তো বাংলাদেশ সরকার কে আহবান জানাল তার দেশের পরিবারকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে। আমি অনেক চেষ্টা করেও একটি ভিডিও একবারে দেখতে পারলাম না কারণ মানুষ হয়ে অন্য মানুষের এত হীনমন্যতা আমার সহ্য হয় না। বাংলাদেশের কমিউনিটির নেতাদের কাছে আমার প্রশ্ন:
আপনারা একদিকে বলছেন ইসলাম শান্তির ধর্ম ! পরক্ষণেই বলছেন আকায়েদকে ঘৃণা করি ঘৃণা করি! ঘৃণা করি! ভাই ঘৃণা কোন পিস আর জাস্টিস এর ভাষা? আকায়েদকে ঘৃণা করেন, না সন্ত্রাস বাদ কে ঘৃণা করেন? এক আকায়েদ সব বাংলাদেশীর মান ইজ্জত শেষ করে দিল !! তো আপনি সারা জীবন বিদেশে থেকে কি ইজ্জত কামাইলেন?
যেভাবে মুখ চোখ বিকৃত করে ঘৃণা জানাচ্ছেন আকায়েদ তা দেখবে ও না জানবেও না। সে তার কাজের শাস্তি কড়ায় গ-ায় ভুগবে সে বহু বছরের জন্য সমাজ থেকে আলাদা হয়ে জেলে থাকবে। এইসব দেখছে কে জানেন আকায়ে়দের পরিবার তার আত্মীয় স্বজন যারা এই সবের জন্য দায়ী না। আপনাদের কালেকটিভ পানিসমেন্ট তারা কি কারণ ভোগ করবে আমি জানি না। আর দেখছি আমরা আমাদের মত মানুষেরা যারা আকায়েদের কর্মকান্ডই যতটা ব্যথিত হয়েছি তার চেয়ে বেশী ব্যথিত হচ্ছি আপনাদের ঘৃণা জানানোর মহোৎসব দেখে!! একটা কথা না বলে পারছি না আমি আপনি বা আপনারা না চাইলেও সে শাস্তি পাবে বরং মুসলিম অভিবাসী হিসাবে অন্যদের থেকে বেশী পাবে।আদর্শলিপি নামক একটি বই ছোটবেলায় পড়তাম পাপকে ঘৃণা কর পাপিকে নয়।আজ ও সেই বই এর আদর্শে জীবন চালাই তাই তো আজ এত কিছু লিখছি।
আপনার সমালোচনা আমিও অনেক করলাম কিছু কাজের কথা বলি। এইসব ঘটনার পর সাধারণ চোখে সব মিটে গেলেও কিছু জায়গায় এইসবের সুবিধা তৈরি হয়-যেমন পুলিশ আমাদের মহল্লা বা মসজিদে নজরদারি বাড়িয়ে দিবে। সাধারণ পোষাকে পুলিশ আসবে নজর রাখতে আবার গুপ্তচর ও পাঠাবে। আমাদের সমাজের মানুষ এর নামে নতুন নতুন কেস বানাবে। এই প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রবিহিন মানুষ কারাগারে যাবে বহিষ্কৃত হবে। আপনার মসজিদে এসে কর্মশালা করে বলবে আপানার বাচ্চাদের উপর নজর রাখতে পরিবর্তন দেখলে তাদের জানাতে এইভাবেই সে আপনার সমাজ সংসারের বিপক্ষে আপনাাকেই গুপ্তচর বানাবে।আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না বা অকারণ ভয় ছড়াচ্ছি না। পূর্বের অনেক আতঙ্কবাদ কেস এর পরে তাদের সমাজের সাথে এইসব হয়েছে। সমাজের বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতা হিসাবে আপনার উচিৎ সবাইকে একসাথে রাখা একে অপরের খোঁজ রাখা। সংগঠন আর মসজিদ গুলিতে অধিকার বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করা। নিজের ছেলে মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব বাড়ানো ও তাদের সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতে উৎসাহ দেওয়া। ভাল করে খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন এই ঘটনার পরে আকায়েদ সম্পর্কিত সকল জায়গায় পুলিশের নজরদারি বেড়েছে আর এই ছেলে খুব একা থাকত সামাজিক যোগাযোগ তার ছিলই না। আমি বলব সম্প্রতিকালে বাংলাদেশ বা এখানে যত ঘটনা ঘটেছে এইসব ঘটনার নায়কেরা বেশির ভাগ নিজেদের অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখত। আমরা আমাদের বাচ্চাদের নজর রাখব মানে না তারা কম্পিউটারে দেখছে বা দরজা কেন বন্ধ করে বসে আছে এই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে খিটিমিটি করে তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবো। আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি নানাবিধ কর্মকা-ের তাদের সংযুক্ত করেও ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারি। এই ঘটনার জন্য কোনভাবেই সমাজের নিরাপত্তার নামে বেশী পুলিশ আমাদের কাম্য হতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসনের সুদূর প্রসারী এন্টি ইমিগ্রেশন নীতি ঠেকাতে ল্যাটিন ও কালো সমাজ তথা সকল সমাজের মানুষের সাথে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
এইবার বলব আকায়েদ এর কথা ছেলেটিকে চিনি না তবে খবর পড়ে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা জানলাম ঢাকায় পালিত একটি ছেলে অভিবাসী হয়ে ৭ বছর ঠেকে এখানে আছে। বেশীর ভাগ সময় একা থাকত নতুন বিয়ে করেছে একটি ৬ মাসের ছেলে আছে। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে গিয়েছিল বাচ্চাকে দেখতে। এই ছেলে সাইকো নয়া হলে নিজেকে মারতে চাইতো না! আমার কথা না মানসিক রোগের ডাক্তাররা বলে যারা আত্মহত্যা করে তাদের শরীরের বাঁচার ইচ্ছা শক্তি কোষ গুলি মরে যায়। আকায়েদ নিজেকে মারার পাশাপাশি অন্যকে মারতে চেয়েছে তাও দুর্বল শক্তিসম্পন্ন বোমা নিয়ে। আমার হিসাবে সে পাগল আর বেকুব দুইটাই। সে তার পরিবার তথা নিজের ছোট অবুঝ বাচ্চাটির কথাও ভাবেনি। সেদিন যখন পুলিশ তার পরিবার এর বাচ্চাদের স্কুল ঠেকে উঠিয়েছে অকারণে তার ভাইকে মহিলাদের হয়রানি করেছে আমাদের সমাজ থেকে কেউ নিন্দা জ্ঞাপন করে পুলিশ কে কিছু বলেনি। কেয়ার আমেরিকার নিউ ইয়র্ক এর উকিলেরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে একে বলে মানবিকতা যা আমাদের নেই।
সর্বশেষ আমার উপদেশ হল, এক ঘটনা মিডিয়াকে ভুলে যেতে দেন রোজ ঘৃণার বীজ ছড়ানো বন্ধ করেন নইলে এক হিসাবে আপনি এই ঘটনা তাজা রাখছেন। ম্যানহাটনের পুর্বের ঘটনা যেখানে ৮ জন মানুষ মারা গেল তা লোকজন ভুলে গেছে কারণ তার সমাজ এর মানুষ রোজ ঘৃণার উৎসব চালিয়ে় ঘটনা তাজা রাখেনি। ট্রাম তার বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছে সে পুরা ইমিগ্রেশন পলিসির পরিবর্তন চায় আর তা যদি তবে সব দেশের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক আকায়েদ আমাদের এত ক্ষতি করতে পারেনি যা বাংলাদেশী হিসাবে আমাদের এত লজ্জিত হতে হবে। সমাজের নেতা হয়ে আপনি যে আমাদের ক্ষতির কারণ হচ্ছেন সেটা বুঝার বোধ কবে হবে আপনার।অ্কারণ নিজের নেতৃত্ব জাহির করার জায়গা অনেক পাবেন আপনারা। আমার অনুরোধ আইন কানুন ও প্রশাসন তথা সাদা সমাজকে আকায়ে়দকে ভুলতে দিন। আকায়েদ এর কাজের জন্য আপনার সাফাই দিতে হবে না কেউ সেটা চায়নি আপনার কাছে। নিজের সমাজের তথা নিজের সংসারে সচেতনতা বাড়ান। ভাল থাকেন। ভাল রাখেন।

Recommended For You