নিউ ইয়র্কে চিকিৎসা বিড়ম্বনা ও আমার অভিজ্ঞতা

সোহেল মাহমুদ: বিনে পয়সায় চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা আছে এখানে। আর সেটা পেতে গিয়ে একজন প্রাথমিক-সেবা-চিকিৎসক (প্রাইমারি কেয়ার ফিজিসিয়ান-পিসিপি) পছন্দ করতে হয়েছে আমাকেও। ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এলাকায় তার চেম্বার। সেখানে প্রথমবার গিয়েছিলাম হাত-পায়ের ব্যথার সমস্যা নিয়ে। সমস্যার কারণে নিয়মিত বিরতিতে দর্শনার্থী হয়ে গেলাম সে চেম্বারে। যে ক’বারই গিয়েছি সেখানে, পিসিপি-দর্শনের সৌভাগ্য আমার হয়নি। নতুন মানুষ।
নিউ ইয়র্কে পা রাখার পর থেকে চারিদিকে হাইকোর্ট আর হাইকোর্ট। হাতি খাদে পড়লে যা হয়। সব জায়গায় জানতে চাওয়ার অভ্যেসটা বাদ দেয়া শুরু করলাম। পিসিপি কেনো আমাকে দেখেন না, সেটা দিয়ে শুরু।
এ চেম্বারে প্রথম দর্শনদিনে মহিলা চিকিৎসকের মুখে আমার কন্ঠের প্রশংসা আর রক্ত-নমুনা নিয়ে নয়ছয় কা-ে খানিক বিরক্ত হলেও আবার যেতে হয়েছে সেখানে। তাও, একমাসের বেশি সময় পর। এর মধ্যে বারবার ফোন করে তাদের কাছে জানতে হয়েছে ল্যাবরেটরি থেকে রিপোর্ট এসেছে কিনা।
দ্বিতীয় দিনেও আমাকে দেখার সময় পাননি আমার পিসিপি। তার চেম্বারের ডেস্ক থেকে আমাকে জানিয়ে দেয়া হলো একজন পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টের ঠিকানা। সাথে, একজন পেডিয়াট্রিসিয়ান (মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট করার কথা জানানো হলো। এই চিকিৎসক আবার সপ্তাহে অন্তত একদিন আমার পিসিপি’র চেম্বার ব্যবহার করেন নিজের রোগী দেখার জন্য। পেডিয়াট্রিক শব্দটার সরল অর্থ শিশুজনিত চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত জানতাম বলে প্রথমে খানিক বিভ্রান্ত ছিলাম।
মাস তিনেকের মতো সময় গেছে শেষের চিকিৎসকের এপয়েন্টমেন্ট পেতে। সে আরেক কাহিনী। এরই মধ্যে, আমি দেড় মাইল দূরে নিউরোলজিস্টের দর্শনপ্রার্থী হয়ে গেছি।
তার কাছে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ফলাফল বড় শূন্য। তিনি জানালেন আমার সমস্যা ভালো হবার নয়। মেনে নিতে হবে। আমি যন্ত্রণায় নীল হয়ে থাকি প্রতি মুহূর্তে। কোন ব্যথানাশক খেতেও বারণ তার। বললেন, “তুমি ওষুধ খেলে ব্যথা কিছুসময়ের জন্য কমবে। কিন্তু, সমস্যার শেষ হবে না। উল্টো তোমার কিডনির ক্ষতি হতে পারে।”
ওষুধ খাচ্ছি না। দু’পায়ে মারাত্মক ব্যথা নিয়ে কাজ। দিনযাপন। পিসিপি’র চেম্বারে গেলাম। কথা শোনার সময় কম। তরুণ একজন দেখছেন আমাকে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছেন। চিকিৎসকসুলভ মনে হলো না আমার। তাকে বললাম, পিসিপি নেই?
“আমি কিন্তু ডাক্তার, সহকারী নই।”- জবাব তার।
আমি কিছু বলতে যাবো, এমন সময় বললেন, চেয়ারে শুয়ে পড়ুন। তথাস্তু। তার কাজ শেষ। চেয়ারে ফিরে গিয়ে কম্পিউটারে লিখতে শুরু করলেন। এরপর বললেন, “আপনাকে ব্যথা কমার ওষুধ দিচ্ছি।”
আমি তাকে থামিয়ে বললাম, “নিউরোলজিস্টতো আমাকে ব্যথার ওষুধ খেতে নিষেধ করেছেন।”
তিনি খানিক বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনি জানেন কি ওষুধ সেটা?”
– “না।”
– “তাহলে, আমি যেটা দিচ্ছি সেটা খেতে থাকুন।”
– “এতে আমার কিডনির ক্ষতি হবে বলেছেন তিনি।”
– “তিনি কি কিডনির ডাক্তার?”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
– “এ ওষুধ খেলে সাথে গ্যাসের ওষুধ খাবেন। দিয়ে দিচ্ছি।”
– “গ্যাসের ওষুধ লাগবে না। সেটা আমার আছে নিউরোলজিস্টের দেয়া।”
– “নিয়ে যান। না খেলে রেখে দেবেন।”
– “খাবো না, নিয়ে লাভ কি? রেখে দিলে নষ্ট হয়ে যাবে। শুধু শুধু পয়সা নষ্ট করে লাভ কি?”
– “আপনারতো পয়সা লাগছে না।”
আমার মাথা খানিক গরম হচ্ছে। সবসময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে। বললাম, “ভাই, আমার লাগছে না, সরকারেরতো লাগছে।”
বড় বড় চোখ করে, বিরক্তি ভরা কন্ঠে “বাচ্চা-চিকিৎসক” বললেন,“আপনি ইউএসএ কতোদিন?”

Recommended For You