ঠ্যাংগার চর জাহাইজ্জার চর হবে না তো?

ঠ্যাংগার চরে যাচ্ছেন বিদেশী সাংবাদিকদের দল। ছবিঃ সন্দ্বীপ

বিশেষ প্রতিনিধি: ১৯১৩ সালে ব্রিটিশরা যে মানচিত্র করে গেছে তাতে সন্দ্বীপের আয়তন অন্তত এক হাজার বর্গমাইল। আর এখন, তিন হাজার বছরেরও পুরনো ঐতিহ্যের এ দ্বীপ আয়তনে একশ’ বর্গমাইলেও নেই। নদী আমাদের সব নিয়ে গেছে। একশ’ বছরে দশভাগের একভাগে গিয়ে ঠেকেছে সন্দ্বীপের আয়তন। হতাশ হবার এমন হিসেবের বিপরীতে আশা জাগানিয়া বড়ো সম্ভাবনা ছিলো। কি নেতৃত্বের ভুলে, কি রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞায় সন্দ্বীপবাসী সম্ভাবনার স এর দেখাও পাচ্ছে না।
দলিল দস্তাবেজ, সরকারী নথি আর যুক্তিতর্ক বলছে, জাহাইজ্জার চর, ঠ্যাংগার চরসহ এর আশেপাশে জেগে ওঠা সব চরই সন্দ্বীপেরই। অথচ, একে একে সব চর চলে গেছে নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলার দখলে।
নিজেদের চর, নিজেদের সম্পত্তি নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর জেগে ওঠা কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়। হঠাৎ করেই। জাহাইজ্জার চরে সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হবার পর, সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়ে সেনা মহড়া দেখার পর পরই এ চরের মালিকানা নিয়ে সোচ্চার হয় সন্দ্বীপের কিছু তরুণ। তাও আবার অনলাইনে। নান ঘাটে জল খেয়ে সেই প্রতিবাদ এখন আন্দোলন। কিভাবে? নতুন আরেকখ- জেগে ওঠা ভূমি ‘ঠ্যাংগার চর’ এ সরকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ঘোষণা দিলে যেনো আঁতে ঘা লাগে সন্দ্বীপবাসীর। অনলাইনে প্রতিবাদকারীদের পক্ষ থেকে শুরু হয় দলমত নির্বিশেষে সবাইকে জাড়িয়ে তোলার উদ্যোগ।
ঠ্যাংগার চরে সরেজেমিন ঘুরে এসেছেন ‘সন্দ্বীপ’ প্রতিনিধি দল। দুই দফায়। প্রথমবার তারা সেখানে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর সংবাদ প্রতিনিধির সাথে। এরপর, ব্রিটেনের ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন (আইটিভি) সংবাদ প্রতিনিধির সাথে।
প্রথমবার সফরে গিয়ে চরে কোন জনমানব কিংবা বসতির কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শেষবারে সেখানে দেখা গেছে নৌ বাহিনীর ক্যাম্প আর হেলিকপ্টার নামার জন্য ব্যবস্থা। এছাড়া, নৌবাহিনীর জাহাজ ভেড়ার জন্য করা হয়েছে বিশেষ পন্টুন।
নৌ বাহিনী কেনো সেখানে? নাম প্রকাশ না করার শর্তে নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত, রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের কাজ করবেন তারা। সবকিছুর আগে সেখানে অবকাঠামো তৈরি করবেন।
রোহিঙ্গাদের ঠ্যাংগার চরে পুনর্বাসন প্রশ্নে সন্দ্বীপের মানুষ আপত্তি তুলেছে। আপত্তি আছে নোয়াখালী বাসীর। সবচেয়ে বড় আপত্তি, যাদের সেখানে পুনর্বাসন করার কথা, সেই রোহিঙ্গাদের। তারা চরে পুনর্বাসিত হতে চান না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কোন কোনটি এরই মধ্যে এমন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে। তাহলে? সরকার কি সত্যিই রোহিঙ্গাদের বঙ্গোপসাগরের­­­ চরাঞ্চলে পুর্নবাসিত করতে চান? নাকি, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ কিছু একটা করতে চায় তারা, এমন বার্তা দিতে এই আয়োজন?
রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার খুব একটা চাপে নেই। এই ইস্যু নানা কারণে আন্তর্জাতিক হতে পারেনি। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে গেলে পুরো প্রক্রিয়ার একটা স্বচ্ছ ও দূর্নীতিমুক্ত অবাকাঠামো থাকতে হবে। এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের সাথে যে মিশে যেতে পারবে না, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এমনিতে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে জনবল দিয়ে সহায়তার অভিযোগ বেশ পুরেেনা। উনিশ শ’ সত্তরের দশকের শেষার্ধে এসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিশেষ কর্মসূচিতে এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী পরিচয়ে ঢুকে পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে। সেখানে তাদের অপরাধ বিবেচিত হয় বাংলাদেশীদের বলে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের কারণেবাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিরাট সংকট তৈরি হয়েছে। এমন নানান বিষয়, সম্ভাবনা আর ভয়কে বিবেচনায় এনে সরকারের ভেতরে একটি মহল জোর বিরোধিতা করছে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের। সরকারের বিভিন্ন মহলে, সরকারী দলের প্রভাবশালী কিছু নেতার সাথে আলাপে বোঝা গেছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কোন কুটনৈতিক চলে সরকার রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের ভেতর, এমনকি বাইরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকেও বাংলাদেশ সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা হচ্ছে। বিরোধিতা জোরদার হতেই পারে। আর সময়ের পরিক্রমায়, এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকার পেছনে ফিরতেই পারে।
তখন, বিশাল ব্যয়ে এই যে অবকাঠামো, সেটা কি নোয়াখালীর ভূমিহীনরা পাবে, না সন্দ্বীপের জনগণ? নাকি, জাহাইজ্জার চরে মতো সেখানে গড়ে উঠবে কোন সামরিক কেন্দ্র?

Recommended For You