জনগণের সরকার এবং আওয়ামী লীগ

সোহেল মাহমুদ: এখন “দঙ্গল” চলছে বাংলাদেশে। যে কোন ইস্যুতে জাতি চরম বিভক্ত। ইস্যু ছোট কি বড় বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ আর বিপক্ষের বিভক্তি। কোটাপ্রথা নিয়ে কি চলছে গত ক’দিন ধরে! এ নিয়ে কারো বক্তব্য কি শুনছে সরকার। কিংবা সরকারের কথা কি শুনতে চাইছে আন্দোলনকারীরা? তেমনতো মনে হচ্ছে না। সবকিছুতে যে যার আচরণ করে যাচ্ছে।
সরকারের আচরণ অতিআত্মবিশ্বাসী লেগেছে আমার কাছে, সেই তাদের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে। প্রতিপক্ষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, অবজ্ঞা করা, তাদের পাত্তা না দেয়া, কোন ঘটনা ঘটিয়ে সহনশীল না হয়ে নিজেদের মতো করে বক্তব্য দেয়া, এগুলো খুব কমন হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের জন্য। এসব কারণে, আলোচনা বা বোঝানোর আর কোন পর্ব থাকে না কিছুতে। ডাইরেক্ট একশন। পরিণতি কি?

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে নিয়ম রক্ষার যে নির্বাচন, তাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। এমন অবস্থা যে কোন রাষ্ট্রের জন্যে ভয়াল পরিস্থিতি তৈরি করে কোন কোন সময়। গণতন্ত্রের জন্যও নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা বিপজ্জনক। কেনো? কারণ, এতে স্বৈরাচারী কিংবা একনায়কত্ব তৈরি হবার প্রচুর সম্ভাবনা থাকে।
একনায়কত্বে কি হয়?
কারো মত পছন্দ হয় না। সরকার, সরকারী দল সহনশীল থাকে না। সাধারণ মানুষের যে কোন দাবিতে সরকারবিরোধী আর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যায়। সরকারী দলের লোকজন সবার মুখ বন্ধ রাখতে পেশীশক্তি ব্যবহার করে। যে কোন ঘটনায় সরকারী ভাষ্যের সাথে সাধারণ মানুষের ধারণার মিল থাকে না। সরকারী বাহিনী কিংবা প্রশাসন আর গণমুখী থাকে না। স্বৈরাচারী কিংবা একনায়কত্বের আরো নানা নেতিবাচক দিক আছে। আপাতত, যা বললাম তাতে কি মনে হয়? বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি?

শেখ হাসিনাকে একনায়ক কিংবা স্বৈরাচার বলার ইচ্ছে নেই। তিনি যে রাজনীতির আবহে বড়ো হয়েছেন আর যে দলের কাণ্ডারি; তাতে সংগঠনবিধ্বংসী এমন ধারার রাজনীতি তিনি চর্চা করবেন, আমি বিশ্বাস করতে চাই না। তার চারপাশে ভালো লোকের সংখ্যাও কম নয়। যাদের রয়েছে সংগঠন আর গণতন্ত্র চর্চায় বহু বছরের অভিজ্ঞতা আর ত্যাগ। আওয়ামী লীগের জনগণের সংগঠন। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। গণসংগঠনের মুল চরিত্রটাই হচ্ছে জনগণের কথা শোনা। তাদের দাবি পূরণ করা। পূরণের সক্ষমতা না থাকলেও নীতিগতভাবে মেনে নেয়া। সংহতি প্রকাশ করা। তারা ভুল দাবি দিলে সেটা যে ভুল বুঝিয়ে দেয়া। সংগঠনে অসহনশীলতার কোন স্থান নেই। সংগঠন চলে প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিয়ে। বাংলাদেশে কি দেখছি আমরা?
আমারতো মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী যাদের কথা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের মুখে আমজনতার কথা থাকে কম। তাদের চিন্তায়ও আমজনতা নেই। যেভাবেই হোক, প্রধানমন্ত্রী জনগণের কথা শুনতে পান কম। জনগণের সাথে তার যে সংশ্লেষ, সেটি এখন আনুষ্ঠানিক। বড় বেশি আনুষ্ঠানিক। অথচ, তাকে নিয়ে “পাশের বাড়ির মেয়েটি” অনুভবের কারণে তিনি “জননেত্রী” উপাধি পেয়েছিলেন। আর এখন মাঝে মাঝে তার কথা শুনে তাকে জনগণেরই প্রতিপক্ষ মনে হয়।
দূরে আছি।
যে কানেক্টিভিটিতে আছি, তাতে দেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাই না। বিশেষ করে সরকারের আচরণ সম্পর্কে। আমার কাছে এটা খুব বেদনাদায়ক। অনেক যুক্তি দেখাতে পারবেন সরকারপন্থীরা। কিন্তু, মেনে নিতে পারবো না। কারণ, আমার এ বিশ্বাস জন্মেছে যে, সরকারের ভেতরে একটা লুম্পেন স্বত্বা তৈরি হয়ে গেছে। এটা কখনো আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীর ছদ্মবেশ ধরে, কখনো ধরে ছাত্রলীগ বা যুবলীগের। সরকারী দলের নামে এরা যা ইচ্ছে করছে। নিজের পছন্দ না হলে সেখানে হামলে পড়ছে। এ লুম্পেন বোধে প্রভাবিত সরকারী নানা প্রতিষ্ঠান আর রাষ্ট্রযন্ত্র। পুলিশ। ব্যাব।

লুম্পেন হচ্ছে একটা বিমূর্ত স্বত্বা। আওয়ামী লীগের সরকারে এখন সে লুম্পেন স্বত্বার প্রভাব খুব। যারা শুধু লুটেপুটে খেতে ব্যস্ত। আর এ লুম্পেন বোধে সংগঠনের কোনো দাম নেই। সাধারণের মতেরও না। তাদের যে কোন শক্তিতে দমিয়ে রাখার কৌশলটাই হচ্ছে এ বোধের শক্তি। অথচ, আমি জেনে এসেছি, দেখে এসেছি, আওয়ামী লীগের শক্তি সংগঠন, জনগণ। একারণেই বলি, জনগণের সাথে দলটির এ সংঘাত কি মেনে নেয়া যায়?
২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ পাওয়ার কারণে তাদের জন্যে একটা বিশাল শক্তি তৈরি হয়েছিলো। বিশাল সুযোগ সামনে চলে এসেছিলো। দেশের মানুষের চেতনায় বিভক্তি দূর করার সুযোগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শতভাগ বাস্তবায়নের সুযোগ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ। সবার নিরাপত্তা আর বিচার পাওয়ার সুযোগ। সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িকতা বৈষম্য নির্মূল করার সুযোগ। নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ। সবচেয়ে জরুরি এবং সবার আগে সুযোগ নেয়া দরকার ছিলো দুর্নীতি দমনের। এসবের মধ্যে, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াও দলটির সাফল্য কোন কোন খাতে? দ্বিতীয় মেয়াদেরও ৪ বছর শেষ হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের।
৯ বছরে ন্যায়বিচার আর সামাজিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশ কি সত্যি এগিয়েছে?

Recommended For You