ছবি এবং বাস্তবতা

সোহেল মাহমুদ: সন্দ্বীপের আওয়ামী-ঘরানার-ফেসবুক-ব্যবহারকারীরা গেলো কয়েক ঘন্টা ধরে এই এক ছবিতে মশগুল। নানা বিশ্লেষণ চলছে এ ছবির। একদম চুলচেরা (চুল ছেড়া নয়)।

ছবিতে দু’জন ব্যক্তি বেশ আলোচিত এবং পরিচিত। বসে আছেন যিনি, বাম থেকে দ্বিতীয়, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। সন্দ্বীপ থানা ছাত্রলীগের একসময়ের প্রাণপুরুষ। এখন আওয়ামী লীগ নেতা। অন্যজন, সবার ডানে, জাফর উল্লাহ টিটু। সন্দ্বীপ পৌরসভার বর্তমান মেয়র। তিনিও আওয়ামী লীগ নেতা। একসময় উপজেলা ছাত্রলীগের প্রাণ ছিলেন।
ছবিটা নিয়ে আলোচনা কেনো?
রাজনীতির প্লাটফর্ম ভিন্ন হবার কারণে নয়। এমনকি, আদর্শও ভিন্ন নয় তাদের। তাহলে? রাজনীতিতে একই আদর্শের হয়েও দু’জনের ভিন্ন মেরুতে অবস্থানের কারণে? আসলে তাই।

সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগ বিভক্ত। অনেক অনেক দিন আগে থেকে। বিভক্তি খুব দৃশ্যমান হয়েছে মাস্টার শাহজাহান আর রফিকুল ইসলামের (আজকের আলোচনার, ছবির রফিকুল ইসলাম নন) দায়িত্বের সময় থেকে (উনিশ সশ’ নব্বুইয়ের দশকের শুরুতে)। সে সময় থেকে সন্দ্বীপের রাজনীতিতে দু’টি প্রকাশ্যগ্রুপ। শাহজাহান, এন্টি শাহজাহান। জনাব শাহজাহান বরাবর সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন (২০০১ সালের পর কয়েকবছর ছাড়া)। অন্যদিকে, বীর মুক্তিযোদ্ধা, হরিশপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও সন্দ্বীপ পৌরসভার সাবেক প্রশাসক রফিকুল ইসলাম ছিটকে পড়েছেন রাজনীতির রেস্লিংয়ে। সন্দ্বীপের একসময়ের সংসদ সদস্য প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন মাস্টার শাহজাহানের পক্ষে। দলে রফিকুল ইসলামের সুবিধা করতে না পারার এটি বড় কারণ।
একসময় মাস্টার শাহজাহানের সাথে সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এখন তার রাজনীতির বড় সমালোচক। প্রতিপক্ষ। আর, মাস্টার শাহজাহানের অনুসারী জাফর উল্লাহ টিটু নিজেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বলয়। প্রবীণ মাস্টার শাহজাহান অবসরে গেলে তার বলয়ের রাজনীতির হালও ধরবেন টিটু, তেমনটা মনে করেন অনেকে। এমনি পরিস্থিতিতে, টিটুও প্রতিপক্ষ মাস্টার শাহজাহানের প্রতিপক্ষের।

এ বলয়ে উত্তারাধিকার সূত্রে শাহজাহান-প্রতিপক্ষের ছায়া এখন প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমানের ছেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা। তাকে ঘিরেই উপজেলা আওয়ামী লীগে গড়ে উঠেছে স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী শাহজাহানবিরোধী গ্রুপ।

বাংলাদেশে প্রতিপক্ষ-সংস্কৃতি বড় নির্মম। বর্বর। ঘৃণায় ভরা। ধ্বংসাত্মক। নেতা-কর্মী-সমর্থক সবাই সেই সংস্কৃতি চর্চা করেন। আর, সে কারণে ঘৃণার শ্লেষ্মায় কন্ঠ ভরা থাকে তাদের। সে কন্ঠে তখন আর ভালোবাসা থাকে না। প্রশংসা থাকে না। শ্রদ্ধার প্রকাশ থাকে না।
রফিকুল ইসলাম টিটুর আতিথ্য নিচ্ছেন।
এ ছবিতে নানা বার্তা আছে। নানা কৌশল থাকতে পারে। নানা ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। কৌশল আর ব্যাখ্যা যাই হোক, এমন সম্মিলন যে উপজেলা আওয়ামী লীগে জরুরি, ঘৃণা-রাজনীতি যারা করেন না, তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন।

সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য সম্মিলন জরুরি। সহাবস্থান জরুরি। যারা বিভক্তি জিইয়ে রেখে মাখন তুলতে চান, তারা কখনোই এমন ছবি পছন্দ করবেন না। আর, তাদের চিন্তা চেতনায় প্রভাবিত হয়ে কর্মী সমর্থকরা ব্যস্ত ঘৃণা ছড়ানোয়।
একবার ভাবুন, যতো শক্তি আপনারা নিজেদের বিনাশে ব্যয় করেন, সেটা দলের সাংগঠনিক বিস্তারে ব্যয় করলে কি হতো?
সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের সংগঠন দুর্বল। কোন্দল শক্তিশালী। কোন্দল ব্যক্তিকে জেতায় হয়তো। দল হেরে যায়।

ভাবুন।

Recommended For You