ক্ষুব্দ বেড়িবাঁধের মানুষ: কাজশেষে ভিটা ফিরে পাবেন, প্রতিশ্রুতি জনপ্রতিনিধিদের

 

রহিম মোহাম্মদ (সন্দ্বীপ থেকে): সন্দ্বীপের বাউরিয়া বেড়িবাঁধের শেষ প্রান্তে স্বপ্নের সাবমেরিন বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ দেখতে প্রতিদিন ভিড় শত শত কৌতুহল মানুষের। কিন্তু উন্নয়নের এ দৃশ্যমান বিশাল কর্মযজ্ঞ খুশী করতে পারেনি এখানকার বেড়িবাঁধে বসবাসকারী ১০০ বছর বয়সী আমিনুল হককে। নিজের বসবাসের ভিটে থেকে উচ্ছেদের নির্দেশে হাঁড়কাপানো এ শীতে বউঝি, নাতী-নাতনী নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন সে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।প্রায় ২০ বছর আগে নদী ভাঙ্গনে কালাপানিয়া থেকে উদ্বাস্হ হয়ে এক দালালকে বিশ হাজার টাকা দিয়ে দখল পায় এ ভিটা। ভিটা থেকে বেদখল হতে হবে এমন চিন্তা কখনও করেননি এ পরিবারের বড় ছেলে জাকের(৫৫)। তিনি ক্ষুব্দ হয়ে বলেন, এভাবে আমাদের উচ্ছেদ আল্লাহ সইবে না। আগামী নির্বাচনের ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন,আমাদেরও সুযোগ আছে সামনে। জাকেরের স্ত্রী নাজমাও (৪৫) তীর্যক ভাষায় বলে উঠলেন, রোহিঙ্গারগো থাকনের জাগার অভাব নাই,অভাব শুধু আন্গোর লাই। আমিনুল হক,জাকের ও নাজমাদের মত ক্ষুব্দ এরকম হাজার অসহায় মানুষের যারা ঘর- বাড়ী হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপের পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছিল।

মেঘনার হিংস্র থাবায় কিংবা দারিদ্র্যতার কষাঘাতে ভিটে বাড়ী হারিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়ে নতুন করে জীবন সাজিয়েছিলেন এসব মানুষ। গুটিকয়েক পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে এলেও বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়া প্রায় পরিবারে দিন আনে দিন খায় অবস্হা। এসব পরিবারের কর্মক্ষম মানুষ বেড়িবাঁধের আশেপাশে গড়ে ওঠা নানা কর্মকান্ডের মাধ্যমে কোনমত জীবিকা নির্বাহ করে চলে।বাঁধ উন্নয়নের খবর তাদের সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে।অল্প সময়ের নোটিশে ভিটে ছাড়ার কঠিন নির্দেশে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন এখানকার প্রায় দশ হাজার পরিবার।কনকনে শীতে পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়িবাঁধের আশেপাশে কোন ভূমিতে ঝুপড়ি বানিয়ে কিংবা কাপড় টাঙ্গিয়ে যাযাবারের মত মানবেতর আশ্রয় নিয়েছেন কেউ কেউ।আতœীয় স্বজনের বাড়ীতে আপাততঃ আশ্রয় নেয়ার প্রচেষ্টা চলছে অনেকের। আবার কেউ ভাবছেন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? উদ্বাস্ত এসব পরিবারকে উচ্ছেদের পূর্বে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্হা করা উচিত ছিল সংশ্লিষ্ট বিভাগের -এমন অভিযোগ মানবাধিকার কর্মী এমদাদুল হক সৈকতের।

জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের সহায়তায় পাউবোর তত্বাবধানে সন্দ্বীপে ৪টি স্লুইচ গেট, কয়েকটি খাল পুনঃখনন, ২৭ কি.মি. বেড়িবাঁধ উঁচুকরন ও সংস্কারে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ কাজে নির্বাচিত ঠিকাদারদের কাজ শুরু করার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কালাপানিয়া,সন্তোষপুর,গাছুয়া, বাউরিয়া,হারামিয়া, মগধরা,মাইটভাঙ্গা অংশে কাজটি শুরু করতে প্রস্তুতি নিয়েছে ঠিকাদাররা। জুনের মধ্যে তাদের এ কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বেড়িবাঁধে ইতোপুর্বে আশ্রয় নেয়া মানুষের স্হাপনাসমূহ তাদের কাজ শুরু করতে জটিলতা সৃষ্টি করেছে।

জাতীয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা সহ সরকারী দলের চেয়ারম্যান ও নেতৃবৃন্দরা বিভিন্ন স্পটে আয়োজিত সভার মাধ্যমে বেড়িবাঁধে আশ্রয় গ্রহনকারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন -তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে। কাজ শেষ হলে প্রত্যেক পরিবার তাদের নিজস্ব ভিটেতে ফিরে যেতে পারবেন।

এলাকার শাসক দলের একজন কর্মী জানান,যারা উচ্ছেদ হচ্ছেন ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে তাদের তালিকা করা হয়েছে,বেড়িবাঁধের মেরামতের কাজ শেষ হলে তারা ঐ জায়গায় ফিরে আসতে পারবেন। সফিক নামের কাছিয়াপাড় বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়া এক যুবক বলেন,গুচ্ছগ্রামে ও ওয়াপদার বিভিন্ন খাল পাড়ে সরকারের অনেক খাস জায়গা আছে যা প্রভাবশালীরা দখল করে আছে। এসব জায়গায় অনেক পরিবারের থাকার ব্যবস্হা করে দেয়া যেতে পারত।তিনি বলেন,বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হলে আমরা ভিটে ফিরে পাব এ নিশ্চয়তা নাই।তখন দেখা যাবে সন্ত্রাসীরা সব দখল করে ফেলছে।

পাউবোর এস.ও ফজলুল হক বলেন,বেড়িবাঁধ অবৈধভাবে দখল করে এতদিন তারা বসবাস করছিলেন,মানবতার কারনে আমাদের বিভাগ কিছু বলেনি।এখনও তারা থাকতে পারবেন তবে বাঁধ উন্নয়নের জন্য সুযোগ দিতে হবে।

নির্বাচনের বছরে একদিকে উন্নয়ন অপরদিকে কয়েক হাজার অসহায় মানুষের উদ্বাস্হ হওয়ার বিষয় নিয়ে মানসিক চাপে আছেন সরকারী দলের নেতৃবৃন্দ। বেড়িবাঁধের কাজ শেষে অসহায় মানুষদের নিজ ভিটায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিদের জোড়ালো ভূমিকা কামনা করছে সাধারন মানুষ। পাশাপাশি বিত্তবানদের শীতার্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Recommended For You