একনায়ক হবার পথে ট্রাম্প?

বিশেষ প্রতিনিধি: বলাবলি সেভাবেই হচ্ছে! ক্ষমতা গ্রহণের একমাসেরও বেশি সময় হতে চললো। এখনো মার্কিন জনগণ তাদের অভূতপূর্ব প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে এমন কিছু পান নি, যাতে তাকে একজন সহনশীল রাষ্ট্রপ্রধান বলতে পারবেন।

ডোনাল্ড জন ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্সির শুরু থেকে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। নিজ দলের (রিপাবলিকান পার্টি) সিনিয়র সদস্যদের অনেকেও ত্যক্ত-বিরক্ত প্রেসিডেন্টের কর্মকান্ডে। এরপরও তার হাত আর মুখ বন্ধ নেই। সই করে চলেছেন নির্বাহী আদেশে। সেইসাথে, বলে চলেছেন নিজের অপছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণের পর পর এমন নানামুখী বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনার নজির দ্বিতীয়টি নেই।
এ রিপোর্ট যখন পড়বেন, তখন হয়তো আরো একটি অভিবাসী বিষয়ক নির্বাহী আদেশ জারির কথা জেনে যাবেন পাঠক। সাত মুসলিম দেশের অভিবাসী নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে সার্কিট আদালতের রায়কে উচ্চ আদালতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করবেন না ঘোষণা দিয়েই একই বিষয়ে নতুন নির্বাহী আদেশ জারি করবেন বলেছিলেন ট্রাম্প। নতুন এ আদেশ সম্পর্কে যতদুর জানা গেছে, আগের সাত মুসলিম দেশকে লক্ষা করেই আসছে এই আদেশ। আগের আদেশের সাথে এর মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। নতুন আদেশে সিরিয়ার শরণার্থীদের নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। আর কিছু ভাষাগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেগুলো শুধু আইনী ঝামেলা মোকাবেলার জন্য। সাত মুসলিম দেশের যারা মার্কিন গ্রীণকার্ডধারী এবং নাগরিক, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবেন না।
ইতোমধ্যে হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পুলিশকেও বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে জারি করা হয়েছে নির্বাহী আদেশ। সবার নজরকাড়া সিদ্ধান্তগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আরো কিছু সিদ্ধান্ত এরমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে, এর বেশিরভাগই আমাদের জানা নেই। কিন্তু, এগুলোর প্রভাবে আমাদেরই ক্ষতি হবে বেশি।
সত্যিকার অর্থে, ট্রাম্প এখন পর্যন্ত এমন কোন কিছুই করেন নি যাতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা আশ্বস্ত হতে পারেন। তার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন। তাকে আস্থায় নিতে পারেন। একজন রাষ্ট্রনায়কের কাজ তার জনগণকে নিরাপদ রাখা, নির্ভয়ে রাখা। ট্রাম্প সেই কাজটি করতেই পারেন নি। আমেরিকার মানুষ নিশ্চিত হতে পেরেছে গত ক’দিনে, মানুষটার সেই বৈশিষ্টটুকু নেই। কল্যাণকর কোন কিছুর সাথে থাকার অনুশীলনও নেই তার। এ কারণে, কেউ কেউ প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাকে বিশ্বাস করতে না পেরে তার মন্ত্রণালয় কিংবা উপদেষ্টার পদ ফিরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। তার সাথে আঞ্চলিক সরকারগুলোর অনেকের সাথে বিরোধ তৈরি হয়েছে। আবার ফেডারেল সরকারের অনেক কর্মকর্তাই সরাসরি তার আদেশের বিরোধীতা করেছেন। সোজাসাপ্টা বলেছেন, তারা প্রেসিডেন্টের আদেশ, নিয়োগের অনেক কিছুই পছন্দ করেন না। সবশেষ, গত সপ্তাহে ট্রাম্পের নীতি ও কর্মকা-ের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন তাঁর এশিয়া আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ (এএপিআইএস) সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিশনের ১০ সদস্য।
প্রেসিডেন্টের সাথে মতভেদ আছে সিনেটে নিজ দলীয় সদস্যদের। এদের কারো কারো বিরোধিতার কারণে এখনো মন্ত্রিসভা ঠিক করা যায় নি। ট্রাম্প মনোনীত করেছেন, কিন্তু সিনেটে এখনো অনুমোদন পান নি কোন কোন মন্ত্রী। এমনকি, এর বাইরেও সরকারী বিভাগে শীর্ষ কর্তাদের অনেককে এখনো নির্বাচন করা যায়নি সিনেটের মতভেদের কারণে। এমন নানা জটিলতায় আছেন প্রেসিডেন্ট।
তিনি বাইরে থেকে জনগণের প্রতিবাদের মুখে আছেন। আর ভেতরে, নিজের ঘরের সদস্যদের বিরোধিতাও মোকাবেলা করছেন।
আমেরিকার কোন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা গ্রহণ করে এমন বৈরি পরিবেশ মোকাবেলা করতে হয়নি। আর এ পরিস্থিতি তৈরি করেছেন ট্রাম্প নিজেই। তিনি গণমাধ্যমের সাথে বিরোধে জড়িয়ে গেছেন। ইউরোপের কোন কোন দেশের বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা কথা বলে বিতর্ক তৈরি করেছেন। চীনের সাথে বিরোধ পাকানোর চেষ্টা করছেন। অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপে অসৌজন্য আচরণ করার কথাও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম।
ট্রাম্প এতোসব করছেন তার একক সিদ্ধান্তে। নিজের পছন্দে। এতে কোন কুটনৈতিক শিষ্টাচার নেই। রাজনৈতিক নেতাসুলভ আচরণ নেই। তিনি যা মনে আসছে, বলছেন। নিজের পদের মর্যাদার কথা ভাবছেন না।
২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দি¦তাকারী সিনেটর জন ম্যাককেইন ট্রাম্পের গণমাধ্যমের সঙ্গে আচরণ প্রসঙ্গে বলেছেন, স্বৈরাচারী কিংবা একনায়করা এভাবেই শুরু করে। ম্যাককেইন অবশ্য সাথে এই বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে একনায়ক বোঝাতে চাননি।
ম্যাককেইন সত্যি প্রতিবাদী মার্কিন জনগণের মনের কথা বলেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়ে, বিশে^র অন্যতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশটিতে প্রেসিডেন্টের আচরণ কিভাবে এমন হতে পারে, এ নিয়ে ভাবনা অনেকেরই।
কারণ, সামনের দিনগুলোতে ট্রাম্প সত্যিই সাধারণ মার্কিন জনগণের কতটুকু ভাববেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

Recommended For You